Image description
রয়টার্সের বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে প্রথম জেন-জি অনুপ্রাণিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার। ২০০৯ সালের পর একে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হিসাবে দেখা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর কোনো কার্যকারিতাই ছিল না। কখনো ভোট বর্জন, কখনো শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের মাধ্যমে তাদের দমন করা হতো। তবে এবার পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। সোমবার বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক তরুণ মনে করছেন, বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। সেই ২০০৯ সালের পর শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসন শুরু হয়েছিল। বর্তমানে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি হলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি জোটও শক্তিশালী। ৩০ বছরের কম বয়সি জেন-জি নেতৃত্বাধীন নতুন দল (এনসিপি) প্রত্যাশিত সমর্থন না পাওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দাবি করেছেন, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট আসন পাবে।

রাজনৈতিক প্রচারণাও আগের নির্বাচনের তুলনায় পুরোপুরি পরিবর্তিত। দেশের প্রতিটি প্রান্তে বিএনপি ও জামায়াতের প্রতীক দেখা যাচ্ছে, মোড়ে মোড়ে প্রচারণা চলছে। এবারের নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই প্রভাব ফেলবে না, দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও চীনের ভূরাজনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে। হাসিনার ক্ষমতা পতনের পর ভারতের প্রভাব কমেছে, আর চীনের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করবে, তবে জামায়াত পাকিস্তানের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে।

নির্বাচনের আগে অপতথ্যের ‘বন্যা’ : বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের ভোটাররা ১২ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার নির্বাচন করবেন। তবে বিশ্লেষকদের সতর্কতা, ভোটারদের সিদ্ধান্ত এক সমন্বিত অপতথ্যের ব্যাপক প্রবাহের কারণে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই অপতথ্যের বড় একটি অংশ আসছে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে।

এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ বলছে, অনলাইনে অপতথ্য ছড়ানোর মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে, তা নিয়ন্ত্রণে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করতে হয়েছে। এই অপতথ্যের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি প্রায় নিখুঁত ভুয়া ছবি ও ভিডিও রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ককে ফোনকল করে সহায়তা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচন ঘিরে ভুল তথ্যের এক ধরনের ‘বন্যা’ দেখা যাচ্ছে। ড. ইউনূস বলেন, এই অপতথ্য আসছে বিদেশি গণমাধ্যম ও দেশের ভেতরের কিছু উৎস থেকে। এই অপতথ্যের বড় একটি অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগকে ঘিরে। অনলাইনে ব্যাপক হারে এমন দাবি ছড়ানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ‘গণহত্যা’ চলছে। এসব পোস্টে ‘Hindu genocide’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেইট জানায়, তারা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ৭ লাখের বেশি পোস্ট শনাক্ত করেছে। এসব পোস্ট শেয়ার করেছে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট। এসব পোস্টে ‘হিন্দু গণহত্যা’র দাবি করা হয়েছে।

সংস্থার প্রধান রাকিব নায়েক এএফপিকে বলেন, ‘এসব কনটেন্টের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে। বাকি অংশ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা সংশ্লিষ্ট হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।’

এএফপি ফ্যাক্ট চেক যেসব দাবি খণ্ডন করেছে, এর মধ্যে কিছু দাবি হাজার হাজারবার শেয়ার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী যার একটি হাত নেই, তিনি দর্শকদের বিএনপিকে ভোট না দিতে অনুরোধ করছেন। এআই নির্মিত আরেক ভিডিওতে এক হিন্দু নারী অভিযোগ করছেন, তার ধর্মের মানুষদের জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে বলা হয়েছে। নইলে তাদের ভারত পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

এএফপি ফ্যাক্ট চেক দল ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে শত শত এআই-নির্মিত ভিডিও শনাক্ত করেছে। কিন্তু এর মধ্যে খুব কম ভিডিওতেই এআই সম্পর্কিত কোনো সতর্কতা বা ডিসক্লেইমার দেওয়া আছে।

আরেকটি এআই-নির্মিত ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু বাংলাদেশি শেখ হাসিনার প্রশংসা করছেন। যেখানে তিনি বর্তমানে পলাতক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে তার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মালিক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির জন্য একটি আলাদা ইউনিটও গঠন করা হয়েছে। তবে অনলাইনে কনটেন্টের বিপুল প্রবাহ সামলানো দুরূহ কাজ। তিনি বলেন, তাদের টিম কোনো কনটেন্ট ক্ষতিকর বা বিভ্রান্তিকর মনে করলে সঙ্গে সঙ্গে সেকে অপতথ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা জেসমিন টুলী বলেন, এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশে এটি একটি বড় হুমকি। কারণ, মানুষ তথ্য যাচাই করার বিষয়ে খুব একটা সচেতন নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া দৃশ্য ও ভিডিওর কারণে ভোটাররা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত্র হচ্ছেন।’