চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোটের প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে যে কর্মকাণ্ড চলছিল, তা শেষ পর্যন্ত নাটকীয় মোড় নিয়েছে। এলডিপির প্রার্থী এম এয়াকুব আলী সরে দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর ডা. ফরিদুল আলমকে সমর্থন দিয়েছেন। এ ঘটনায় আসনটির ভোটারদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটলেও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
আজ বৃহস্পতিবার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে লিখিত বক্তব্যে এম এয়াকুব আলী বলেন, ‘আমি চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসন থেকে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোট সমর্থিত ও এলডিপি মনোনীত প্রার্থী ছিলাম।
এয়াকুব আলী আরো বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের পর প্রতীক পেলেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রচারণা শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়েছে।
জোটের রাজনীতিতে ত্যাগের বার্তা
এম এয়াকুব আলীর এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক আত্মত্যাগ হিসেবে দেখছেন জোটের শরিক দলগুলো।
এলডিপির নেতাকর্মীরাও একই সুরে বলেন, রাজনীতিতে জয়-পরাজয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ঐক্য। এয়াকুব আলীর সিদ্ধান্ত ১১ দলীয় জোটকে আরো সুসংহত করবে।
শেষ মুহূর্তে উত্তপ্ত ছিল পটিয়ার রাজনীতি
গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১২ দিন আগে পর্যন্ত চট্টগ্রাম-১২ আসনের রাজনৈতিক মাঠ ছিল চরম অনিশ্চয়তায়।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কর্মী ও মাঠপর্যায়ের চাপ উপেক্ষা করা কঠিন হওয়ায় তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যেবক্ষণ করছিলেন।
এক জোটের দুই প্রার্থী নিয়ে বিপাকে পড়ে তৃণমূল
একই জোটের দুই প্রার্থী মাঠে থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে দেখা দেয় চরম বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ। কোথাও কোথাও সমর্থকদের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধও দেখা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জোটের এক নেতা বলেন, এই সংকট দ্রুত নিরসন না হলে ভোটারদের মধ্যে বিভাজনের বড় ঝুঁকি ছিল। শেষ পর্যন্ত বিষয়টির সমাধান হওয়ায় জোট এখন তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আদর্শিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং দলের সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মাঠে কার্যকর করতে ব্যর্থ হলে তার দায় দলকেই নিতে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত এলডিপি প্রার্থী এম এয়াকুব আলীর সরে দাঁড়ানো ও জামায়াত প্রার্থী ডা. ফরিদুল আলমকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম-১২ আসনে জোটের রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা মিলেছে।
লড়াই হবে দ্বিমুখী
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ আসনে বিএনপির এনামুল হক এনামের সঙ্গে জামায়াতের ডা. ফরিদুল আলমের। এমনিতেই পটিয়ায় রাজনীতির মাঠে বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটার রয়েছে। তবে আসনটিতে ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী রয়েছেন ছৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু (মোমবাতি প্রতীক)। ফলে লড়াইয়ে ইসলামপন্থী ভোটব্যাঙ্ক বিভক্ত হতে পারে, যা অতীতে আওয়ামী লীগের অনুকূলে ছিল। একইভাবে এই নির্বাচনে বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোকে আরো সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে।
নির্বাচনে অন্য প্রার্থীরা
নির্বাচনে আরো চারজন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁরা হলেন জাতীয় পার্টির ফরিদ আহম্মদ চৌধুরী (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র প্রার্থী শাখাওয়াত হোসাইন (ফুটবল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এস এম বেলাল নুর (হাতপাখা) এবং ইনসানিয়াত বিপ্লবের আবু তালেব হেলালী (আপেল)।
আগের নির্বাচনের ফলাফল
আসনটিতে আগের নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বরাবরই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। ১৯৯১ সালে বিএনপির শাহনেওয়াজ চৌধুরী মন্টু ৪৮ হাজার ৭১৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন, তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের এস এম ইউসুফ পান ৩৯ হাজার ২১৫ ভোট। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েল যথাক্রমে ৪৯ হাজার ২৪৮ এবং ৭৯ হাজার ৯১৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সামশুল হক চৌধুরী এক লাখ তিন হাজার ৮৬৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যখন বিএনপির জুয়েল পান ৭৫ হাজার ০৫৬ ভোট।
২০১৪ সালে বিএনপির নির্বাচনে বয়কটের পর জয়ী প্রার্থী হিসেবে সামশুল হকের প্রাপ্ত ভোট দেখানো হয় এক লাখ ২৮ হাজার ২১৪ ভোট পান। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে সামশুল হকের প্রাপ্ত ভোট দেখানো হয় এক লাখ ৮৩ হাজার ১৭৯ ভোট। আর বিএনপির এনামুল হকের ৪৪ হাজার ৫৯৮। সবশেষ ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী এক লাখ ২০ হাজার ৩১৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী সামশুল হকের প্রাপ্ত ভোট দেখানো হয় ৩৫ হাজার ২৪০ ভোট।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে বর্তমানে ভোটার বেড়ে মোট সংখ্যা তিন লাখ ৪৯ হাজার ৪৯৫। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৮১ হাজার ৪১৫, নারী এক লাখ ৬৮ হাজার ০৭৯ এবং শিখণ্ডী সম্প্রদায় (হিজড়া)-এর ১ ভোট। এবারের নির্বাচনে এ আসনে পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করেছেন তিন হাজার ২০০ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ দুই হাজার ৮৩৯ জন ও নারী ৩৬১ জন।