Image description

দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে প্রকাশ্যে-পর্দার আড়ালে যা করা দরকার, জামায়াত তাই করছে। প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে ভোটারদের অর্থ, কথা যেখানে যা প্রয়োজন সেভাবে নিজেদের পক্ষে টানছে।

তিনি বলেন, এবারের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে একসময় বিএনপির ছায়ায় দেশের রাজনীতিতে বেড়ে উঠা জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে যখন আওয়ামী লীগ স্ট্রিম রোলার চালিয়েছে, তখন জামায়াতকে মাঠে দেখা যায়নি; বরং কমিউনিস্টদের মতো জামায়াত কৌঁসুলি রাজনীতির নামে আওয়ামী লীগে গেছে।

তিনি বলেন, ৪০ বছর ধরে ইনকিলাবের সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি হিসেবে কাজ করছি অনেক বছর ধরে। পেশাগত কারণে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি অনেক কূটনীতিকের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তাদের সঙ্গে সবসময় উঠাবসা আছে।

তিনি জানান, সে সুবাদে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর সব ধরনের কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর পাই। বিভিন্ন মানুষের দেওয়া তথ্যে জানতে পারি, নির্বাচনে বিজয়ী হতে জামায়াত কিভাবে সর্বাত্মক চতুর্মুখী প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

ইনকিলাব সম্পাদক বলেন, জামায়াত ‘আর্থিকভাবে দুর্বল নারীদের আর্থিক সহায়তা, এটা-সেটা উপহার, জায়নামাজ, তসবিহ উপহার দিচ্ছে। গরিব কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের আইডি কার্ডের নম্বর এবং বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। অনেক ভোটারকে আর্থিক সহায়তা করছে এবং নির্বাচনের আগে আরো সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। শুধু আমিই পাচ্ছি না, এসব খবর গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন প্রকাশ পাচ্ছে। কিছু এলাকায় বিএনপির কর্মীরা প্রতিবাদও করছেন।’

তিনি বলেন, ‘গ্রামের এবং মফস্বল শহর ও রাজধানী ঢাকার বস্তিতে বসবাস করা নিম্নআয়ের মানুষকে যারা পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেবেন, গরিব মানুষ তো তাকেই ভোট দেবে। প্রতিপক্ষ দলের বিকাশে ভোটারদের টাকা পাঠানোর সংস্কৃতি ঠেকাতে এবং এর বিপরীতে বিএনপি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের ভাবতে হবে।’

‘ভুল করার সুযোগ নেই বিএনপির’ শিরোনামে লেখা এক বিশেষ নিবন্ধে এ এম এম বাহাউদ্দীন এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ সোমবার (২রা ফেব্রুয়ারি) ইনকিলাবের ছাপা সংস্করণের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে।

ইনকিলাবের ওয়েবসাইট থেকে লেখাটির লিংক ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনদের মধ্যে এ এম এম বাহাউদ্দীনের বক্তব্য নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা ও পর্যালোচনা চলছে।

এ এম এম বাহাউদ্দীন বিশেষ নিবন্ধে বলেন, ‘শুনেছি ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানকে পরাজিত করতে জামায়াত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ডা. খালেদুজ্জামান ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। ওই আসনের বিপুল সংখ্যক ভোটার বস্তির বাসিন্দা। আর্থিকভাবে দুর্বল বস্তিবাসীদের জামায়াত নানাভাবে আথিক সহায়তা করছে। অথচ বিএনপি প্রার্থী তারেক রহমানের পক্ষে তেমন কিছুই করা হচ্ছে না। আর্থিকভাবে দুর্বল বস্তিবাসীদের ভোট টাকার বিনিময়ে প্রতিপক্ষের বাক্সে যাওয়া ঠেকানোর কী কোনো উদ্যোগ বিএনপি চেয়ারম্যানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নিয়েছেন?’

তিনি লেখেন, ‘এবারের নির্বাচনে বিএনপির ভুল করার সুযোগ নেই। দেশের রাজনীতিতে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। তারা এখন নেই। এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে একসময় বিএনপির ছায়ায় দেশের রাজনীতিতে বেড়ে উঠা জামায়াত। বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ সালের নির্বাচনগুলোর সংসদের আসন সংখ্যা ও ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনসমর্থনের দিক দিয়ে বিএনপির অনেক পেছনে জামায়াতের অবস্থান।’

তিনি বলেন, ‘‘আবার ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের ‘অতি বাড়াবাড়ি রকম আওয়াজ’ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় দলটির ‘বট’ বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণায় মনে হচ্ছে দলটি যেন ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে; অপেক্ষা শুধু নির্বাচন। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে যা যা করা প্রয়োজন, জামায়াত তাই করছে। নির্বাচন এবং যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী হতে ন্যায়-অন্যায়, নীতি-নৈতিকতা গৌণ।’’

তিনি বলেন, ‘শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের আর্থিকভাবে দুর্বল এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর ভোট ধানের শীষের ঘরে তুলতে বিএনপি কী কোনো কার্যকর সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিচ্ছে? নাকি জনগণ ভোট বিএনপিকে দেবেই এই চিন্তা নিয়ে ঘরে বসে থাকলেই জনগণ বাধ্য হয়েই বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠাবে? প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের প্যাকেট বিদেশে জামায়াত নেতার বাসায় আবিষ্কারের পর হইচই হয়েছে। বিএনপি নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছে। কিন্তু অভিযোগ করে লাভ কী কিছু হয়েছে?’

এ এম এম বাহাউদ্দীন বলেন, ছাত্রশিবির গুপ্ত রাজনীতির কৌশল নিয়ে ছাত্রলীগের ভেতরে থেকে হেলমেট ও লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত জামায়াত নেতারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলো সরাসরি নজর রাখছে। ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ দেখলে সেটি বোঝা যায়। আবার একাধিক শক্তিশালী মুসলিম দেশ এবার জামায়াতকে আর্থিক সহায়তাসহ বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছে। সেই জামায়াতকে নির্বাচনে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বিএনপিকে। বিএনপির বাইরের কোনো শক্তি তেমন নেই; দেশের ভোটারই হচ্ছে বিএনপির শক্তি। কাজেই বিএনপিকে তো চোখ-কান খোলা রেখে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হবে।

তিনি বলেন, ইসলামী ধারার দল জামায়াত, অথচ হিন্দুদের ভোট পেতে দলের হিন্দু শাখা খুলেছে। পূজামণ্ডপে গিয়ে গীতা পাঠ করেছে। মুসলমানের রোজা ও হিন্দুদের পূজা একই বৃন্তের দুই ফুল তথা রোজা ও পূজা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বক্তব্য দিয়েছে। দেশের অর্ধেক ভোটার নারী, তারপরও শিক্ষিত কর্মজীবী নারীদের ঘরে রাখা এবং নারীদের অফিস-আদালতের কাজে নিরুৎসাহিত করার ম্যাসেজ দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আবার দলটি নারী সদস্যদের ঘরে ঘরে পাঠাচ্ছে সাধারণ ধর্মভীরু গৃহিণীদের নিজেদের দিকে টানছে। জামায়াতকে ভোট দিলে জান্নাতের টিকিট বক্তব্য তো অনেক আগেই ভাইরাল হয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে দলটির প্রার্থী ও নেতাদের উঠান বৈঠক, মহিলা নেত্রীদের ঘরে ঘরে উঠান বৈঠক, ধর্মীয় দুর্বলতা উসকে দিয়ে গৃহিণীদের মগজ ধোলাই করছে।

তিনি বলেন, আরেকটি কথা না বললেই নয়; বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াত ও তার ‘বট’ বাহিনী যেভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিএনপিকে একাই লড়তে হচ্ছে। মিত্র দলগুলোর সিনিয়র নেতারা মনোকষ্টের কারণে নীরব। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মিত্র দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে আনতে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী মাঠে নামলে মিত্র দলগুলোও বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াতের অপপ্রচারের জবাব দেবে।

ইনকিলাব সম্পাদক লেখেন, চারদিক থেকে জামায়াতের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠলে দলটি ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না। পাশাপাশি দলের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনের মাঠে থাকা বিদ্রোহী প্রার্থীরা কোণঠাসা হয়ে যাবে।