Image description

কারাগার থেকে বন্দীরা কেমন করে পালায়, তা ‘দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন’, ‘প্যাপিলন’, ‘এসকেপ ফ্রম প্রিটোরিয়া’ কিংবা ‘কুল হ্যান্ড লিউক’–এর মতো সিনেমায় দেখেছেন অনেকে। বাস্তবেও যে তা ঘটে, তা দেখিয়ে দিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ময়মনসিংহের ঘটনা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার থেকে সম্প্রতি হৃদয় মিয়া (২৮) নামের এক হাজতি নাম ভাঁড়িয়ে বেরিয়ে আসেন। জামিন হয়েছিল দিদার হোসেন (২৮) নামে আরেক আসামির। কিন্তু দিদার সেজে বেরিয়ে পড়েন হৃদয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেল সুপার মো. ওবায়দুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, হৃদয় অন্য আসামির নাম-ঠিকানা ও জামিনের কাগজ ব্যবহার করে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। কর্তব্যরত কারারক্ষীরা তাঁকে দিদার হোসেন মনে করে মুক্তি দেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অনৈতিক লাভের আশায় অন্য আসামিরা হৃদয়কে পালাতে সহায়তা করেছেন।

হৃদয়ের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার নিমবাড়ি মধ্যপাড়ায়। একটি মামলার আসামি হয়ে কারাগারে ছিলেন তিনি। গত ২৯ জানুয়ারি সকাল ১১টায় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে পালিয়ে যান তিনি।

কারা সূত্র জানায়, মুক্তির সময় হৃদয় অন্য হাজতির নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের দিদার কারাগারে ছিলেন, তাঁর জামিনের আদেশ হয়েছিল। সেই আদেশ ব্যবহার করেই দিদার সেজে বেরিয়ে যান হৃদয়।

এই ঘটনার তদন্ত করে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় ডেপুটি জেলার আজহারুল ইসলাম এবং ছয়জন কারারক্ষীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যরা হলেন মোরশেদ আলম, মো. হানিফ মিয়া, শাহাব উদ্দিন, রবিউল আলম, মোহাম্মদ জাহিদ হাসান, মোহাম্মদ আবু খায়ের।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারফাইল ছবি

কারা কর্মকর্তারা জানান, দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও কারারক্ষীরা যথাযথ তদারকি করেননি। এর ফলে হৃদয় মূল গেট থেকে অন্য হাজতির রূপ ধারণ করে বের হয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।

হৃদয় পালানোর ঘটনায় পাঁচ হাজতি ও দুই কয়েদির বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলাও হয়েছে। তাতে আসামি করা হয়েছে হৃদয় ও দিদার দুজনকেই। অন্য আসামিরা হলেন হাজতি বিল্লাল মিয়া (২২), কয়েদি পলাশ হোসেন (২৫), কয়েদি আক্তার হোসেন ছোটন (৩০), হাজতি শিপন মিয়া (৪৫), হাজতি মনির হোসেন (৫৫)।

ময়মনসিংহে ‘ভুল’ করে মুক্তি

ভুয়া জামিননামা, তথ্য জালিয়াতি বা কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে আসামি অদলবদলের ঘটনা আগেও ঘটেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার দুদিন আগে ময়মনসিংহ কারাগার থেকে ‘ভুলবশত’ মুক্তি পান তিন বন্দী।

এ তিনজন হলেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার মধ্যতারাটি পশ্চিমপাড়া গ্রামের আনিছ মিয়া (৩২), রাশেদুল ইসলাম (২৫) ও জাকিরুল ইসলাম (২৮)।

হত্যা মামলায় ২৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে কারাগারে ছিলেন এই তিন আসামি। জামিন না হলেও ২৭ জানুয়ারি কারাগার থেকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর ২৯ জানুয়ারি রাতে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে র‍্যাব।

ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ‘ভুলবশত’ মুক্তি পাওয়া হত্যা মামলার আসামি তিনজনকে পরে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব
ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ‘ভুলবশত’ মুক্তি পাওয়া হত্যা মামলার আসামি তিনজনকে পরে গ্রেপ্তার করে র‍্যাবফাইল ছবি: প্রথম আলো

ময়মনসিংহের সিনিয়র জেল সুপার আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কারাগারের এক কর্মকর্তা ভুলবশত আসামিদের মুক্তি দিয়েছেন। এটি অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটেছে।

‘ভুল’টি কী হয়েছিল, তা জানিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগের কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, প্রোডাকশন ওয়ারেন্টকে (হাজিরা পরোয়ানা) ভুল করে জামিননামা ভেবে তিন আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

এই ঘটনায় কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) টিপু সুলতানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

কুমিল্লায় আয়নাবাজি

কুমিল্লার ঘটনাটি বাংলাদেশের ‘আয়নাবাজি’ সিনেমার মতোই। গত সেপ্টেম্বরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় কুমিল্লার আদালতে হাজির হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করেন এক ব্যক্তি। গত ১২ আগস্ট আদালত সেই আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কিন্তু কারাগারে নেওয়ার পর আসামির আঙুলের ছাপ নিতেই সামনে আসে ভিন্ন এক গল্প। আঙুলের ছাপে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি আসামি জোবাইদ পুতিয়া নন, তাঁর নাম নুর মোহাম্মদ।

এরও আগে চাঁদাবাজির অভিযোগে করা এক মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করতে এসেছিলেন আসামি ইব্রাহীম খান ওরফে ভাগনে তুষার নামে এক ব্যক্তি। তাঁকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরে জামিনের সময় ধরা পড়ে, ইব্রাহীম সেজে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যাওয়া ব্যক্তিটি তাঁর ‘বন্ধু’ সাইফ ইসলাম।

এমন ঘটনা আরও

এর আগে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মইয়ের সাহায্যে পালিয়ে যান যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি আবু বক্কর ছিদ্দিক। তিনি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। পালানোর পর তাঁর কোনো খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি।

বাগেরহাট জেলা কারাগার থেকে রাজু নামের এক বন্দী আরেক বন্দীর নামে বেরিয়ে গিয়ে এখনো লাপাত্তা। হারুনুর রশিদ নামের ডাকাতি মামলার এক আসামি ২০২১ সালে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানা থেকে পালিয়ে যান।

বন্দী পালানোর ঘটনা কেন বাড়ছে—জানতে চাইলে সাবেক এক কারা মহাপরিদর্শক কারা কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতিকেই দায়ী করেন।

তিনি বলেন, ‘দায়ী কারারক্ষীরাও। ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদেরও দায় রয়েছে। যাঁদের জন্য এসব অপরাধ হচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেই এসব বাড়ছে। বন্দী বা কয়েদি পালানোর পর আটক করাটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো পালালেন কীভাবে?’