প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন কর্মকর্তারা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বঞ্চনা কাটাতে অবসরের পরও ৭০০-এর বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। অথচ জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতিতে বঞ্চিতদের সংখ্যা বেড়েছে। যোগ্যতা অর্জন করেও প্রায় ২ শতাধিক কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব হতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নানা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও পদোন্নতিতে নাম না থাকায় বিষয়টিকে পক্ষপাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কেন নিরপেক্ষ বিচার না করে বঞ্চিত করা হলো সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে সে প্রশ্ন।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ১৫ দিন আগে দেওয়া হয় অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি। বিসিএস ২০তম ব্যাচকে অগ্রাধিকার দিয়ে ১১৮ জনের পদোন্নতির আদেশ জারি হয়। জনপ্রশাসন সূত্র জানায়, দেশের বাইরে অথবা লিয়েনে কর্মরত থাকায় আরও ৬ জনের জিও পরবর্তীতে জারি করা হবে।
২০০১ সালের ২ মে ২০ ব্যাচের কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দেন। যুগ্ম সচিব পদে চার বছর পার করে পদোন্নতি মিললেও বঞ্চনা বেড়েছে বহু কর্মকর্তার। এ পদোন্নতির পর বাদ পড়া সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নানা সমালোচনা হচ্ছে। একাধিক সূত্র জানায়, এই ব্যাচে পদোন্নতির যোগ্য ছিল ২৫৬ কর্মকর্তা। এ ছাড়া লেফট আউট, ইকোনমিক ও আদার্স সব মিলিয়ে প্রায় তিনশর কিছু বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতির জন্য বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বিগত সময়ে সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের পিএস, ডিসির দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে সুনামের সঙ্গে কাজ করা কর্মকর্তারাও পদোন্নতি পাননি। নিয়মিত ব্যাচ থেকে এত সংখ্যক কর্মকর্তা বাদ পড়ার বিষয়টি ভালোভাবে দেখছেন না প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যেই বঞ্চিতরা জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গে দেখা করে পদোন্নতি পুনঃপর্যালোচনার (রিভিউ) জন্য আবেদন করেছেন। তবে এই পুনঃপর্যালোচনার সারা পাবে না বলেও মনে করছেন অনেকে। এর আগে উপসচিব ও যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতিতে বাদ পড়া কর্মকর্তারা পুনঃপর্যালোচনার আবেদন কয়েক মাসেও সাড়া পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে একাধিক যুগ্মসচিব ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক যুগ্মসচিব বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কেন বঞ্চিত শব্দটি থাকবে। যারা চাকরিতে একেবারে দলদাস তাদের মানা যায়। আসলে বর্তমান সরকারও দলীয় সরকারের মতোই আচরণ করেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয়, শৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা ও অনুসন্ধান চলমান এবং বিভিন্ন এজেন্সির নেতিবাচক প্রতিবেদন রয়েছে, তারা পদোন্নতি পাওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। তবে কী কারণে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি জনপ্রশাসন থেকে কর্মকর্তাদের এটি কখনোই জানানো হয় না। এ কারণে যাকে তাকে বঞ্চিত করাটাও মন্ত্রণালয়ের জন্য সহজ পথ মনে করেন অনেকে। ফলে মন্ত্রণালয়ের প্রতিও কর্মকর্তাদের অবিশ্বাস রয়েছে। অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব এবং উপসচিব হতে না পারা বঞ্চিতদের তালিকাটা এখন প্রায় সাড়ে চারশর বেশি।
গত বছর যোগ্যতা অর্জন করেও উপসচিব ও যুগ্মসচিব পদোন্নতিতেও ৩ শতাধিকের মতো কর্মকর্তা বঞ্চিত হন। বিসিএস ২৪তম ব্যাচের যুগ্মসচিব পদোন্নতির সময় অন্তত ১৮৩ জন কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন। আর সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতি পাননি বিসিএস ৩০তম ব্যাচের ৭৯ জন কর্মকর্তা। বঞ্চিত হওয়া ৩০ ও ২৪ ব্যাচের সবাই রিভিউ চেয়ে আবেদন করে রাখলেও গত কয়েক মাসে সেটির অগ্রগতি নেই।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের সময়মতো পদোন্নতি দেওয়া না হলে এক ধরনের ক্ষোভ, হতাশা দেখা দেয়। যারা পদোন্নতি দিচ্ছেন তারাও কিন্তু বঞ্চিত ছিলেন তবুও সেই বঞ্চনার ব্যথা না বুঝলে বিষয়টি দুঃখজনক। বেঞ্চ মার্ক না থাকলে বা মামলা থাকলে সেটা যৌক্তিক কারণ হতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় বা গোয়েন্দা রিপোর্টে বঞ্চিত করাটা যৌক্তিক নয়।