বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে কর্মরত অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে পিএইচডি করার সময়ই দেশটির নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন সাবেক মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। বিদেশী নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফিরে তিনি প্রশাসনিক ক্যারিয়ার অব্যাহত রাখেন।
ড. কায়কাউসের কর্মজীবন শুরু হয় ২১ জানুয়ারি ১৯৮৬ সালে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদানের মাধ্যমে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ মাঠ প্রশাসন ও সচিবালয়ের বিভিন্ন পদে কাজ করেন তিনি। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হন। ২০১৭ সালে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তাকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় এবং ২০২০ সালে পুনর্নিয়োগ পান। বিদেশী নাগরিকত্বের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও নিউইয়র্কে রয়েছে তার একাধিক সম্পত্তিও। বর্তমানে তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থান করছেন এবং একটি লবিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
কেবল ড. আহমদ কায়কাউসই নন, অভিযোগ রয়েছে বিদেশে যেসব বাংলাদেশী বড় অংকের সম্পদ গড়েছেন তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই সরকারি আমলা। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ি কেনা, ব্যবসায় বিনিয়োগ, ব্যাংক হিসাবে অর্থ রাখা কিংবা পরিবারের সদস্যদের ওইসব দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমলাদের স্ত্রীরা বিদেশী নাগরিকত্ব নিয়ে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করছেন এবং সন্তানরা সেখানেই পড়াশোনা করছে। আবার নিজের পাসপোর্টেও দীর্ঘমেয়াদি ভিসা লাগানো রয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব, আর্থিক খাত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা-সম্পর্কিত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিযোগ বেশি শোনা যায়।
আমলাদের বিদেশে নাগরিকত্ব, পরিবার ও সম্পদের এ প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য দেশের সরকারি বড় কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ প্রবণতা রয়েছে। চীনে সরকারি চাকরি করেও বহু কর্মকর্তার স্ত্রী ও সন্তান বিদেশে বসবাস এবং সেখানে সম্পদ গড়ার বিষয়টি প্রথম দৃশ্যমান হতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে। এ প্রবণতা দ্রুত বাড়তে থাকে ২০০৩ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে। ওই সময় চীনে দুর্নীতি ও ঘুসও বেড়ে যায়। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় সহজ হয় চীনা অভিবাসন। এ সুযোগে অনেক কর্মকর্তা পরিবারকে বিদেশে বসবাসের ব্যবস্থা করেন এবং নিজেরা থাকেন ক্ষমতার কাছাকাছি। এ প্রেক্ষাপটে ‘নেকেড অফিশিয়াল’ ধারণাটি সামনে আনে বেইজিং। নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।
সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের স্ত্রী ও সন্তান দেশের বাইরে থাকেন, তাদেরই মূলত ‘নেকেড অফিশিয়াল’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ধরনের প্রবণতা দুর্নীতির জন্য বেশ সহায়ক। এর মধ্য দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা দেশের বাইরে অর্থ পাঠানোর সুযোগ পান বলে মনে করা হয়। এ কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের স্ত্রী-সন্তানদের বিদেশে পাঠানো বন্ধে ২০১০ সালে একটি বিধিমালা জারি করে চীনা সরকার।
চীনের যেসব কর্মকর্তার স্ত্রী ও সন্তান বিদেশে বসবাস করেন তাদের নাম, অবস্থান ও সম্পদের তথ্য লিখিতভাবে জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় ২০১৩ সালের পর, শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদার হলে। ২০১৪ সালে জারি করা বিধিমালায় বলা হয়, যাদের স্ত্রী বা সন্তান বিদেশে থাকেন তারা সামরিক, কূটনৈতিক, জাতীয় নিরাপত্তা ও গোপনীয় দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। এ পর্যায়ে শাস্তির ধরন ছিল প্রধানত পদাবনতি বা কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বদলি। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের বলা হয়, পরিবার দেশে ফিরিয়ে আনলে তারা দায়িত্বে থাকতে পারবেন।
শেষ ধাপে শুরু হয় ২০২৫ সালের দিকে, যখন চীন এ নীতিকে আরো কঠোর করে। বেইজিং স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবারকে দেশে ফেরাতে হবে, অন্যথায় ছাড়তে হবে পদ। পরিবার দেশে না ফেরায় দেশটির অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তখন দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হন। সামগ্রিকভাবে এ নীতির মাধ্যমে চীন আমলাদের বিদেশে পরিবার ও সম্পদনির্ভরতা কমানো এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, যা তাদের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অংশে রূপ নিয়েছে।
বেইজিং আমলাদের বিদেশে পরিবার ও সম্পদের প্রশ্নকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় শাসননীতির অংশ হিসেবে নিয়েছে এবং নীতিমালা ও নিয়োগ-সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার আওতায় আনতে চেয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে আমলাদের বিদেশে নাগরিকত্ব, পরিবার ও সম্পদের প্রশ্নটি এখনো আড়ালেই থেকে গেছে। ২০২০ সালের নভেম্বরে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, যারা টাকা পাচার করে বিদেশে বাড়ি করেছেন, তাদের মধ্যে আমলাদের সংখ্যাই বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে চীনের ‘নেকেড অফিশিয়াল’ নীতির আদলে একটি কাঠামো গ্রহণ করতে পারত। এ ধরনের নীতির আওতায় উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে অবস্থানরত পরিবার, সম্পদ ও আর্থিক স্বার্থের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশের ব্যবস্থা রাখা যেত। একই সঙ্গে যেসব পদকে ঝুঁকিপূর্ণ বা স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে বিদেশে পরিবার বা সম্পদ থাকা কর্মকর্তাদের নিয়োগে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা সম্ভব হতো। এছাড়া অনিয়ম বা স্বার্থসংঘাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে পদাবনতি কিংবা পদচ্যুতির মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও কার্যকর করা যেত। এতে আমলাতন্ত্রের ভেতরে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতো।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোনো কর্মকর্তার পরিবার বিদেশে স্থায়ীভাবে অবস্থান করলে তার ওপর বহুমাত্রিক চাপ ও স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ‘নেকেড অফিশিয়াল’-এর মতো নীতি গ্রহণ প্রশাসনে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও শৃঙ্খলা জোরদারের একটি কার্যকর উপায় হতে পারত।
আমলাদের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানিয়েছেন সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর দেশে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, দুর্নীতি দমনের প্রশ্নে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে চীন আমলাদের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি অনুসরণ করা হয়। সেখানে যেসব সরকারি কর্মকর্তা বা তাদের পরিবারের সদস্যরা বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তাদের উচ্চ পদে পদায়ন করা হয় না। অনেক সরকারি কর্মকর্তা আগে পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাঠান, পরে নিজেরাও বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পথ তৈরি করেন। একই সঙ্গে তারা দেশে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পালন করেন। এ দ্বৈত অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়।’
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করা ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি যদি দেশের বাইরে গড়ে ওঠে, তবে নীতিনির্ধারণে স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়—দীর্ঘদিন ধরেই এমন আলোচনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নীতিমালা বা বাধ্যতামূলক প্রকাশ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। চাকরিবিধিতে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ থাকলেও তা কার্যকরভাবে তদারকির কোনো কাঠামো নেই। সম্পদের বিবরণী জমা দেয়ার নিয়ম থাকলেও বিদেশে সম্পদ বা পরিবারের অবস্থান নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ খুব সীমিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নির্বাচন, পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের আলোচনা জোরালো হয়। কিন্তু আমলাদের বিদেশে সম্পদ ও পরিবারের অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রবণতায় রাশ টানার মতো কোনো উদ্যোগ স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো বদলের কথা বলা হলেও যারা এসব প্রতিষ্ঠান চালান তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও নিরাপত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত আসেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের পর সংস্কার প্রক্রিয়া মূলত প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু আমলাতন্ত্র নিজেই একটি শক্তিশালী শ্রেণী, যাদের হাতে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। তাদের জীবনযাপন, সম্পদের উৎস ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন না তুললে সংস্কার আংশিক থেকে যায়। তাদের মতে, বিদেশে সম্পদ ও পরিবার থাকা শুধু নৈতিক বা আর্থিক বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্পর্কের প্রশ্নও বটে। এ সম্পর্ক স্পষ্ট না করলে প্রশাসনিক সংস্কার কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার প্রভাব সীমিতই থেকে যায়।
এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়নি। দুর্নীতি দমন ও জনপ্রশাসন সংস্কার—এ দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও বাস্তবে সেভাবে অগ্রগতি দেখা যায়নি। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন যে সার্বিক সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিল, সেখানে দুর্নীতি প্রতিরোধ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে কমিশনের প্রস্তাবের মধ্য থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন ও সীমিত বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন হয়নি। যেসব প্রস্তাব অধ্যাদেশ বা সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেয়া হয়নি।’
ইফতেখারুজ্জামানের মতে, বাস্তবে যা হয়েছে তা হলো কিছু নির্বাচিত ও সুবিধাজনক ক্ষেত্রে সীমিত পদক্ষেপ নেয়া। কোথাও কোথাও প্রশাসনের ভেতরের অসন্তোষ বা বিরোধ দমনের উদ্দেশ্যে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ দেখা গেছে, কিন্তু তা প্রকৃত অর্থে জনপ্রশাসন সংস্কার নয়। তিনি আরো বলেন, ‘জনপ্রশাসনের সংস্কার বলতে শুধু বেতন-ভাতা বৃদ্ধি বা বিচ্ছিন্ন কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সম্পদের হিসাব, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ন্যায্যতা এ মৌলিক বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উচ্চ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের বিদেশী নাগরিকত্বের বিষয়ে এক সময় তীব্র কড়াকড়ি ছিল। আগে সরকারি কর্মচারীরা বিদেশী কোনো নাগরিককে বিয়েও করতে পারতেন না। এক-এগারো সরকারের আমলে পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের এক কর্মকর্তা বেলজিয়াম প্রবাসী একজনকে বিয়ে করার অনুমতি চান। সে সময় সরকার সেটি আমলে নিয়ে নিয়ম শিথিল করে। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এসব ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিজেও ২০২৫ সালের শুরুতে বিভিন্ন সংস্থার কাছে সরকারি কর্মচারী ও রাষ্ট্রীয় রাজস্বভুক্ত বেতনভোগীদের মধ্যে দ্বৈত নাগরিকত্ব বা বিদেশী পাসপোর্টধারীদের তথ্য চেয়েছিল। দুদক সতর্ক করে জানায়, সরকারি কর্মচারীরা গোপনে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও বিদেশী পাসপোর্ট গ্রহণ করছেন, যাতে দুর্নীতি তদন্ত ও আইনি দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিছু কর্মকর্তা সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪০ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে বিদেশী পাসপোর্ট নিয়েছেন। এ ধরনের আচরণ বিদেশে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ গোপন করা এবং জবাবদিহিতা এড়ানোর সুযোগ দেয়।
সংস্থাটি আরো জানায়, কিছু কর্মকর্তা দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ ব্যবহার করে শুধু অর্থ পাচারই করছেন না, বরং দেশের অর্থনীতি ও সরকারি সেবার সততা ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। এছাড়া বিগত সরকারের আমলে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেককে নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করতে হয়েছে, অনেককে চাকরিচ্যুত করা হয়।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ বছরের শাসনামলে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকাণ্ডের জন্য প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ব্যয় হওয়া এ টাকা থেকে ঘুস হিসেবেই চলে গেছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে ৭৭ হাজার কোটি থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা ঘুস গেছে আমলাদের পকেটে। ঘুসের অর্থের বেশির ভাগ প্রবাসে থাকা আমলাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ মানে শুধু একটি পাসপোর্ট পাওয়া নয়; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ জড়িত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা, নীতিনির্ধারণ ও সাংবিধানিক গুরুত্বসম্পন্ন পদগুলোতে দ্বৈত নাগরিকদের রাখা উচিত নয়। মন্ত্রী, এমপি, সচিবালয়ের নীতিনির্ধারণী পদ, প্রতিরক্ষা, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, জেলা প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ। এসব জায়গায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে, তাই এখানে কেবল একক আনুগত্য থাকা জরুরি।
এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়টি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে আইনে বলা আছে, তাদের অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। তবে চুক্তিভিত্তিক বা প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্বকে বাধা হিসেবে ধরা হয়নি। ফলে একজন ব্যক্তি বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেও চুক্তিভিত্তিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করতে পারছেন, যা একটি বড় অস্পষ্টতা তৈরি করেছে। দ্বৈত নাগরিক কেউ এমপি বা মন্ত্রী হতে পারেন না কারণ এসব পদে থাকতে হলে শুধু বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয়। কিন্তু একই ব্যক্তি যদি চুক্তিভিত্তিকভাবে সচিব বা উচ্চ প্রশাসনিক পদে থাকতে পারেন, তাহলে সেটি যুক্তিসংগত বৈপরীত্য তৈরি করে। অর্থাৎ, যাকে মন্ত্রী হওয়ার জন্য বিশ্বাস করা যায় না, তাকেই আবার প্রশাসনের শীর্ষ পদে বিশ্বাস করা হচ্ছে—এটি পরিষ্কার অসামঞ্জস্য।’
তিনি আরো বলেন, ‘৫ আগস্টের পর যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার অংশ হিসেবে সরকার চাইলে এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে পারত—কোন কোন পদে শুধু বাংলাদেশের নাগরিকরা যোগ্য হবেন এবং কোথায় দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকার সে রকম কোনো স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেয়নি।’