প্রথমবারের মতো এবার জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে হচ্ছে ‘গণভোট’। সরকারের তরফ থেকে চলছে গণভোটের প্রচারণা। তবে প্রার্থীদের সেভাবে গণভোটের প্রচারণা চালাতে দেখা যায়নি। বেশির ভাগ ভোটারও গণভোটের বিষয়ে অজ্ঞ। তারা কেউ কেউ জানেন না একই দিনে দুটো ভোট দিতে হবে। গণভোট নিয়ে সন্দিহান তারা। রয়েছেন দোটানায়। বেশির ভাগই জানেন না গণভোট কী। শিক্ষিত থেকে শুরু করে সকল পেশার মানুষের মাঝে একধরনের দ্বিধা রয়েছে- গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিলে কী হবে কিংবা ‘না’ ভোট দিলে কী হবে। একটি অংশ আছে, যারা জানেনই না সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট নামের আরেকটি ভোট হবে। ভোটাররা দুটো ব্যালটে এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন- এই বিষয়টি জানেন না অনেকেই।
ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা পলাশ আকন্দ। গণভোটের বিষয়ে জানেন কিনা জানতে চাইলে পলাশ জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা দেখেছেন। তবে নিজে এখনো যাচাই করেননি কেন তিনি হ্যাঁ বা না ভোট দেবেন। তিনি বলেন, সরকার জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয় আমার মতো দেশের অন্তত ৭০ ভাগ ভোটারই এ বিষয়টি জানে না। সবাই প্রতীকের পেছনেই আছেন। আমি নিজে এখনো পরিষ্কার না, কী জন্য হ্যাঁ ভোট দেবো আর কি জন্য না ভোট দেবো।
ঢাকা-১২ আসনের বড় মগবাজার এলাকার কাঁচা তরকারি ব্যবসায়ী হালিম গণভোটের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, দুইরকম ভোট হবে এটা জানি। একটি ভোট প্রতীকের, আরেকটি ভোট হ্যাঁ এবং না-এর। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো কিছু দাবি- দাওয়া দিয়েছে, সেগুলো যদি বাস্তবায়ন করতে চায় তাহলে হ্যাঁ ভোট দিতে হবে। আবার যদি সরকারের পক্ষে নিতে চাই সেক্ষেত্রে ‘না’ ভোট দিতে হবে।
মৌচাক এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুমন বলেন, গণভোট বা দুইটা ভোট দিতে হবে- এ বিষয়ে আমি কেবল জানলাম। কেন হ্যাঁ বা না ভোট দেবো? প্রশ্ন করেন সুমন। জুলাই সনদ নিয়ে জানালে সুমন বলেন, ’তাহলে তো সকলকে হ্যাঁ ভোটই দেয়া দরকার’। কিন্তু আমরা তো ঠিকমতো জানি না এই জুলাই সনদের মধ্যে কী আছে আর কী কী সংস্কার করা হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে কাজ করেন সাদাত। তিনি এবার প্রথম ভোট দেবেন ঢাকা-১২ আসন থেকে। সাদাত নতুন চাকরির জন্য পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের কাজে এসেছেন শান্তিনগর এলাকায়। তিনি বলেন, এবারই যেহেতু নতুন ভোটার আমি। তাই অনেক কিছুই আমার কাছে অজানা। তবুও, হ্যাঁ ভোট বলতে আমি বুঝি, আমি যদি সংস্কারের পক্ষে থাকি, তাহলে আমি হ্যাঁ দেবো। আর সংস্কার না চাইলে না ভোট দেবো
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম কিশোরগঞ্জের ভোটার। ঢাকায় রিকশা চালান রাজারবাগ-কমলাপুর এলাকায়। তিনি বলেন, গত ১৫ বছর ভোট দিতে পারিনি। এবার একটা আশা-আকাঙ্ক্ষা আছে। ভোট দেবো। তবে কাকে ভোট দেবো এখনো ভাবিনি। হ্যাঁ না ভোট নিয়ে জানেন কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আগে কেন্দ্রে যাই; তারপর ভেবে দেখবো কী দেয়া যায়।
রাজারবাগ এলাকার হার্ডওয়্যারের দোকানি জামাল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, এবার ভোট দুটো দিতে হবে- হ্যাঁ এবং না ভোট।
তেজগাঁও এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিক মিঠু বলেন, ভোট হবে এতটুকু জানি। কিন্তু দুইটা ভোট হবে কী হবে না- এরকম কিছু জানি না। আমার অন্য কিছু নিয়ে আগ্রহ নেই, ঢাকার বাইরে যাবো, ভোট দিয়ে আসবো বাড়িতে গিয়ে। গণভোটের বিষয়ে জানতে হবে আমাকে।
গণভোট সম্পর্কে সচেতন ৪০ শতাংশ মানুষ: বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) জানিয়েছে, দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোট সম্পর্কে সচেতন। আর ৩০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হবে। বুধবার এই তথ্য উপস্থাপন করে সংস্থাটি। বিইআই জানায়, গণভোট নিয়ে বেশির ভাগ মানুষের কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই। ৫০ শতাংশ নাগরিক নির্বাচন পরবর্তী দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। আর ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ সহিংসতাবর্জিত নির্বাচন হবে বলে প্রত্যাশা করেন।
বিইআই তথ্য উপস্থাপনকালে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশে আগের ১২টি নির্বাচন থেকে আলাদা। কারণ, এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রূপান্তরে যাত্রা শুরু করবে কিনা। রাজনৈতিক দল, বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট মহল যদি এই বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটা বড় বিপদের মুখোমুখি হবে। বিদ্যমান সংবিধান অতীতে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ তৈরিতে সহায়তা করেছে। বিদ্যমান সংবিধানকে অক্ষুণ্ন রেখে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। জুলাই জাতীয় সনদকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটা চুক্তি, এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে।