জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র ক’দিন বাকি। প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা। তবে গুজব আর অপতথ্যে সবাইকে শঙ্কিত করে তুলছে। একে-অপরকে উদ্দেশ্যে করে দিচ্ছে আক্রমণাত্মক পোস্ট। এমনকী পোস্টের মাধ্যমে প্রকাশ্যে খুনের হুমকিও দেয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য কিংবা এআই নির্মিত ছবি-ভিডিও ছড়ানোয় ঝুঁকিও বেড়েছে। পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে এই অপতথ্য-গুজব। এরকম বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষপূর্ণ ও উত্তেজনাকর পোস্টে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরিতে রয়েছে শঙ্কা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, আক্রমণাত্মক পোস্ট ও অপতথ্যে প্রভাব পড়বে নির্বাচনে। তবে এসব ঠেকাতে সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে পুলিশের সাইবার ইউনিট।
সম্প্রতি শেরপুরে ঝিনাইগাতি উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপি’র সঙ্গে সংঘর্ষে উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হয়েছেন। এ ঘটনাকে নিয়ে নাজমুল হাসান নামে আইডি থেকে এক ব্যক্তির আক্রমণাত্মক পোস্টের কার্ড ভাইরাল হয়েছে। ইতিমধ্যে এই পোস্টকে ঘিরে শুরু হয়েছে পাল্টা জবাব। পোস্টটিতে লেখা হয়েছে- ‘আজকে জামায়াত নেতাকে খুনের প্রতিশোধ হিসেবে তারেক রহমানকে রাস্তায় ফেলে কোপাতে হবে।’ তবে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ে এই নামে পোস্টের ব্যক্তির আইডি সার্চ দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া গত ১৫ই জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মূলধারার দৈনিক একটি পত্রিকার ডিজাইন সংবলিত একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়, তাতে লেখা ছিল, ‘সুখবর সুখবর সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে ফিরছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা, রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের আভাস পেলাম।’ কিন্তু রিউমার স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এরকম শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড পত্রিকাটি প্রকাশ করেনি। শুধু এসব ঘটনাই নয়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাইবার মাধ্যমে প্রতিদিনই ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপতথ্য, গুজব ও অক্রমণাত্মক পোস্ট। মূহূর্তেই এসব পোস্টে শুরু হয়ে যায় পাল্টা আলোচনা-সমালোচনা। এসব সাইবার আক্রমণ ও গুজব ছড়িয়ে পড়া দমানো অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নির্বাচন ঘিরে জানুয়ারি মাসের ২৭ দিনে অনন্ত ৩৯৩টি ভুল তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এ ছাড়াও তাদের পরিসংখ্যান বলছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সব মিলিয়ে এক বছরে রাজনীতির বিষয়ে ২ হাজার ২৮১টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যা অন্যসব ক্যাটাগরি থেকে বেশি। এই তথ্য স্পষ্টভাবে ঈঙ্গিত করে যে, রাজনৈতিক ইস্যুই ছিল গত বছর ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রধান ক্ষেত্র। ক্যাটাগরি হিসেবে একক মাসে ভুল তথ্য বেশি শনাক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই (ডিসেম্বরে ৪৪৬টি)। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর এআই-ডিপফেকের ব্যবহার বেড়েছে ৪০৯ শতাংশ। আর নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে অপতথ্যের প্রবাহ। আশঙ্কা করা হচ্ছে গুজবকারীদের টার্গেটে পরিণত হতে পারেন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা।
টার্গেট করে প্রার্থীদের নিয়ে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিও ক্লিপস তাদের যেমন অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এসব নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইনে গুজব, অপপ্রচার ও ভুয়া প্রচারণা মোকাবিলায় সারা দেশে সমন্বিত ও জোরালো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে একটি মিসইনফরমেশন প্রতিরোধ সেলও চালু করা হয়েছে। ওই সেলের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল, বিটিআরসি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফরম একযোগে কাজ করছে। নির্বাচন সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়ানো গুজব-অপপ্রচার ও সাইবার সন্ত্রাস ঠেকাতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনিটরিং টিম।
ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি। সিআইডিও এ বিষয়ে নজরদারি করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী ফেসবুক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিও, অডিও ও ছবি ছড়িয়ে দিচ্ছে। আবার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও টেলিগ্রামসহ অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। দেশ-বিদেশ দুই জায়গায় বসেই অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। সম্প্রতি টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব গণমাধ্যমকে বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অনলাইন গুজব, অপপ্রচার ও ফলস প্রোপাগান্ডা মোকাবিলায় সারা দেশে সমন্বিত ও জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি মিস ইনফরমেশন প্রতিরোধ সেল ইতিমধ্যে চালু হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলেন, ইউটিউব-ফেসবুক হলো প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের ব্যক্তিদের শনাক্ত করা ও শাস্তি দেয়ার দুই-চারটা উদাহরণ স্থাপিত হলেই দেখা যাবে, জনগণ মামলা বা জেলহাজতে যাওয়ার ভয়ে এ কাজগুলো করার আর সাহস পাবে না।
সিআইডি’র সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সিআইডি’র সাইবার সেলে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টা তারা মনিটরিং করছে।
ডিবি’র সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের দক্ষিণ বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, নির্বাচন ঘিরে সাইবার মাধ্যমে যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে আমরা তৎপর রয়েছি। চব্বিশ ঘণ্টাই আমাদের সাইবার প্যাট্রলিং অব্যাহত রয়েছে।