Image description
 

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশটির বেসামরিক মানুষ ও সরকারবিরোধী শক্তির ওপর আকাশপথে হামলার জন্য ক্রমে প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার ব্যবহার করছে।

গতকাল সোমবার মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটসের এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ামনারে চলমান গৃহযুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনী প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টারের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এসব ব্যবহারের খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য। তা ছাড়া এগুলো নিচ দিয়ে উড়তে পারে। এতে করে লক্ষ্য নির্ধারণে ভুলের পরিমাণ কমে আসে। শত্রুরা টের পাওয়ার আগে হামলা চালানো যায়।

ফর্টিফাই রাইটসের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে প্রথম প্যারামোটর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। আর ২০২৫ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো জাইরোকপ্টার দিয়ে হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়।

প্যারামোটর মূলত একধরনের প্যারাগ্লাইডার, যা ব্যাকপ্যাকের মধ্যে থাকা মোটর ও প্রপেলার দিয়ে উড়তে পারে। আর জাইরোকপ্টার হলো এক বা দুই আসনের হালকা উড়োজাহাজ, যার ওপরে হেলিকপ্টারের মতো ঘূর্ণায়মান ব্লেড থাকে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার থেকে পাইলটরা হাতে ধরে মর্টার শেল বা বিস্ফোরক নিচে ফেলে হামলা চালান। অনেক ক্ষেত্রে প্যারামোটরের ইঞ্জিন বন্ধ করে শেষ মুহূর্তে নিঃশব্দে ভেসে এসে হামলা চালানো হয়, যা প্রতিরোধকে আরও কঠিন করে তোলে।

ফর্টিফাই রাইটসের গবেষক চিত সেং বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার ব্যবহার করে আকাশ থেকে বেসামরিক মানুষ হত্যার নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে। এসব উড়োজাহাজে হাতে ফেলা, নিয়ন্ত্রণহীন বিস্ফোরক ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি ঘটেছে ২০২৫ সালের অক্টোবরে। তখন সাগাইং অঞ্চলে নির্বাচনবিরোধী এক মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচিতে একটি প্যারামোটর থেকে দুটি মর্টার শেল ফেলা হয়। এতে অন্তত ২৪ জন নিহত হন। একই অঞ্চলে আরেকটি ঘটনায় একটি হাসপাতালে জাইরোকপ্টার হামলায় প্রধান চিকিৎসকসহ তিনজন নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এর কয়েক মাসের মাসের মধ্যে দেশটিতে গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়। এতে দেশটির পুরোনো সশস্ত্র অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী যোগ দেয়। সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে।

রাজনৈতিক বন্দী ও সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্সের (এএপিপি) তথ্যমতে, অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৭০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।

ফর্টিফাই রাইটস জানায়, বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৩০৪টি প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে বিদ্রোহীরা সামরিক নিশানা লক্ষ্য করেও এ ধরনের কিছু হামলা চালিয়েছে। এতে করে উল্লিখিত সময়ে মোট ৩৫০টি প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি)।

এসব হামলার বেশির ভাগ ঘটেছে মিয়ানমারের সাগাইং, মাগওয়ে, মান্দালয়, আয়েয়ারওয়াদি ও বাগো অঞ্চলে। এসব এলাকা সমতল হওয়ায় নিচ দিয়ে ওড়া এসব উড়োজাহাজ ব্যবহার সহজ। একই সঙ্গে এসব অঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল, যা সেনাবাহিনীর জন্য সুবিধাজনক।

লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) বিশ্লেষক মরগান মাইকেলস বলেন, প্যারামোটর ব্যবহারের মাধ্যমে সেনাবাহিনী তাদের বিমানবাহিনীর ওপর চাপ কমাচ্ছে। এতে আধুনিক যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার সীমান্তবর্তী এলাকায় মোতায়েন করা সহজ হচ্ছে।

মরগান মাইকেলস আরও বলেন, এসব হামলা প্রমাণ করে, কেন্দ্রীয় মিয়ানমারে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনী এখনো আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছে। অন্যদিকে বিরোধী শক্তিগুলো বেসামরিক মানুষকে (জান্তার) আকাশপথের হামলা থেকে রক্ষা করতে পারছে না।

এদিকে আলাদা এক বিশ্লেষণে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তথাকথিত ‘পরিচয়হীন’ বা ‘গোস্ট শিপ’ ব্যবহার করে মিয়ানমারে বিমানের জ্বালানি প্রবেশ করছে। এসব জাহাজ অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করে।

জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ফর্টিফাই রাইটসের আহ্বান, নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টারের যন্ত্রাংশসহ দুই কাজে ব্যবহার করা যায়, এমন প্রযুক্তি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে পৌঁছানো ঠেকাতে।

শীর্ষনিউজ