বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির কারণে গত অর্থবছরে সরকার লোকসান দিয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এ সময় অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৭ হাজার কোটি টাকার লোকসানের বোঝা এখন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ঘাড়ে। এর আগের বছরও বিদ্যুৎ খাতে লোকসান প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এর বিপরীতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু ফ্যাসিস্ট সরকারে ওপর দায় চাপালে ও প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। গুরুত্বপূর্ণ এ সেক্টেরে উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। সরকারিভাবে উদ্যোগ বাস্তবায়ন না করায় কারণে বড় ধরনের লোডশেডিং হয় প্রতি গ্রীষ্মকালে।
জ্বালানি আমদানি-নির্ভরতা, গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া ও পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবসানÑ সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আগামী তিন থেকে চার বছর পর দেশের বিদ্যুৎ খাতে তীব্র সঙ্কটের আশঙ্কা। আগামীর নতুন সরকারের জন্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভারসাম্য আনাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যান্ত্রিক ত্রুটিতে চার দিন বন্ধ থাকার পর দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিট আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরেছে।
অপরদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (ইপিএসএমপি ২০২৫) অবিলম্বে স্থগিত ও সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানিয়েছে তারা বলেছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে এবং জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)।
বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ খাতে কয়েকটি আইন ও কিছু প্রকল্প বাতিল করা ছাড়া তেমন কোনো নতুন পরিকল্পনা এবং অগ্রগতি দেখাতে পাচ্ছে না। রমজান ও সেচে বিদ্যুৎ অস্থিরতার শঙ্কা। বিদ্যুতই নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ, ঝুঁকিতে বেসরকারি বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না : হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা, বিদ্যুৎ চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতি পাওয়া গেছে।
ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি। এই চুক্তি বাতিল করতে সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার জোরালো পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। একই সঙ্গে চুক্তির নেপথ্যে সাত-আটজন ব্যক্তির কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যা অধিকতর তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। তবে আদানি পাওয়ার বলছে, পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন বা এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ তাদের সঙ্গে করা হয়নি। এদিকে বিশেষ বিধান আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তি দেশের স্বার্থ বিবেচনায় করা হয়নি, চুক্তি হয়েছে ব্যক্তি বিশেষকে সুবিধা দেয়ার জন্য। বিদ্যুতের উৎপাদন চারগুণ, আর ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ২০ গুণের বেশি বেড়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় কমিটি। গতকাল রোববার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০ এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় জাতীয় কমিটি সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছে।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৯টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এই বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাতিল করে। এগুলোর মধ্যে ৪০টি কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়া হবে। ১০টি কেন্দ্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করে বিদ্যুৎ বিভাগ। কিন্তু দরপত্রের শর্তের কারণে বিগত সময়ে বিদ্যুৎ খাতে সুবিধাপ্রাপ্ত ও এসব কেন্দ্র স্থাপনে অনুমতির শেষ পর্যায়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোই এবারো এগিয়ে। বিগত আমলে সুবিধা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র পাইয়ে দিতে নেপথ্যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট আলোচনা করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৪৮টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি দেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ১০টি উৎপাদনে এসেছে, বাকিগুলো নির্মাণাধীন।
এর মধ্যে সরকারি মালিকানার কেন্দ্র সাতটি, বাকিগুলো বেসরকারি মালিকানার। এসব কেন্দ্রের মধ্যে দুটি বায়ু ও দুটি বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ওই ৫৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাতিল করে। এগুলোর মধ্যে ১০টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র আগে নির্ধারিত স্থানে নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে নেয়া ১৪টি দেশের ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অনিয়মের অভিযোগে বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে চীনের চারটি, সিঙ্গাপুরের সাতটি এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি করে প্রকল্প রয়েছে। বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলে চীনা বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন। এরই মধ্যে ১৫টি কোম্পানি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করেছে। পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একই সাথে ভারতের আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হলে চার হাজারের বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমাদের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।
এদিকে বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লোংগি বাংলাদেশে একটি অফিস স্থাপন এবং সোলার প্যানেল উৎপাদনে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। বেশ কয়েকটি শীর্ষ সোলার প্যানেল নির্মাতা বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের জন্য গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সফর করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। পরে কমপক্ষে ২০ বছর ব্যবহারযোগ্য ভবনের ছাদে এক হাজার বর্গফুট বা তার বেশি জায়গা থাকলে নেট মিটার পদ্ধতিতে রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনে বিধান যুক্ত করে পরিপত্র জারি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ পরিপত্র গত বছর ২৩ ডিসেম্বর জারি করা হয়। তবে গত দেড় বছরে রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনের কাযক্রম শুরু করা হয়নি।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে আস্থার সংকট ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে দায়িয়েছে। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিল থেকে পূর্বনির্ধারিত জরিমানা কর্তন, চলমান সালিশ প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অমান্য এবং দেশীয় ও বিদেশি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণের অভিযোগÑ সব মিলিয়ে খাতটির স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ বড় ধরনের চাপে পড়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আসন্ন রমজান মাস, গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। রাজধানীর নির্মাণাধীন ভবনের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ছয় মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে ওয়াসা, রাজউক এবং বিদ্যুৎ বিভাগ কোনো ধরনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। সম্প্রতি আদালত এই আদেশ দেন।
রিহ্যাবের রিট পিটিশনের (রিট পিটিশন নং ২১১৭১/২০২৫) কারণে এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজি এবং বিচারপতি রাজিউদ্দিন আহমেদ এ আদেশ দেন। বিগত কয়েক মাসে রাজউক, ডেসকো, ডিপিডিসি ও অন্যান্য বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির সহায়তায় বিভিন্ন নির্মাণাধীন ও আংশিক সম্পন্ন ভবন থেকে প্রায় এক হাজার ২০০টির বেশি বিদ্যুৎ মিটার বিচ্ছিন্ন করা হয়। মূলত ডেভেলপারদের প্রকল্পে বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় অনেক নির্মাণ প্রকল্প কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। রিহ্যাবের আবেদনের প্রেক্ষিতেই আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এই অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
প্রায় ৩০টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিরুদ্ধে অতিরিক্ত উৎপাদন বন্ধকাল দেখিয়ে পূর্বনির্ধারিত জরিমানা কর্তনের অভিযোগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) সালিশ আবেদন রয়েছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণ ছিল বিপিডিবির দীর্ঘদিনের বিল পরিশোধে ব্যর্থতা। গত ৮ জানুয়ারি বিইআরসি আবেদনগুলো খারিজ করে উভয় পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে সালিশ চলমান থাকা অবস্থায় জরিমানা গণনা ও কর্তনের বিষয়ে বিদ্যমান অবস্থা অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপরও পিডিবি কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা বিল থেকে জরিমানা কেটে নেয়। বিদ্যুৎ খাতে এখনো অরাজক অবস্থা চলছে। বর্তমান সরকার এ খাতকে এখনো শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে পারেনি।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসানাত অভিযোগ করে ইনকিলাবকে বলেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এক ধরনের দ্বৈতনীতি অনুসরণ করছে। বিদেশি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে চুক্তিতে জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা হচ্ছে না। দেশীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়মিতভাবে জরিমানা কর্তনের মুখে পড়ছে।
পর্যালোচনা জাতীয় কমিটির সদস্য বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সাত হাজার ৯০০ মেগাওয়াট থেকে সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট হয়, প্রয়োজন নেই অথবা জ্বালানি বা অবকাঠামোর অভাবে ব্যবহারই করা যায় না। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫০ শতাংশ, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪৫ শতাংশ এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। বিশেষ বিধান আইনের আড়ালে ক্রয় ও চুক্তি প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে রাষ্ট্র দখলের রূপ নেয়। যেখানে লেনদেন-ভিত্তিক সম্পর্কের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ ও চুক্তি সীমিত সংখ্যক স্বার্থান্বেষীর পক্ষে ঝুঁকে পড়ে। এসব চুক্তির কারণে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনছে বিপিডিবি। ২০২৫ অর্থবছরে ঘাটতি ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। ঘাটতি ঠেকাতে গেলে পাইকারি দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। আর ৮৬ শতাংশ দাম বাড়ালে ভারত-চীন-ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। ওইসব দেশের শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না বাংলাদেশের শিল্প। বিশেষ বিধান আইন বাতিল করা যথেষ্ট মনে করছে না কমিটি। ওই আইনের আওতায় সম্পাদিত আদানি চুক্তি বাতিল, অন্যান্য চুক্তি পর্যালোচনা করা, সব চুক্তি না হলেও যেসব চুক্তির মাধ্যমে রক্তক্ষরণ হচ্ছে সেগুলোতে ছুরি চালানোর পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।
কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানির চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এত ভালো তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় বিরল। তিনি বলেন, আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান মহেশখালী না হয়ে গোড্ডা কেন, কেউ জানে না। সবাই জানে, ভারতের কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রফতানির জন্য ব্যবহার করা যায় না। তাহলে অস্ট্রেলিয়ান বা ইন্দোনেশিয়ান কয়লা ঝাড়খ-ে নেয়ার মানে কী? বাংলাদেশে প্ল্যান্ট কেন নয়? এ বিষয়ে বিপিডিবিতে কোনো আলোচনার রেকর্ড নেই। কেন ভারতের বা অন্য কোনো দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের দাম বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহার করা হলো না, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা নেই। বিদ্যুৎ বিভাগ যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক দুর্নীতি মামলার বিশেষজ্ঞ দল ও বাংলাদেশি আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি আইনি টিম নিয়োগ করেছে, যারা তথ্য যাচাই-বাছাই করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব।
জানা গেছে, দেশে ১৩৫ কেন্দ্রে প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আছে। এর মধ্যে আইপিপি হচ্ছে ৭০টি। এগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১১ হাজার মেগাওয়াট। বাকিগুলো সরকারি কেন্দ্র। তবে পুরো বিতরণ ব্যবস্থায় এখন নির্ভরযোগ্য হচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে আটটি কেন্দ্রে উৎপাদন ক্ষমতা ছয় হাজার ২০০ মেগাওয়াট। পিডিবি থেকে বলা হয়, আগের বছরের চেয়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। গত অর্থবছরে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪৮ দশমিক ৫২ শতাংশ গ্যাসের কেন্দ্র থেকে, ফার্নেস অয়েলে ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ডিজেলে দশমিক ৪৬ শতাংশ, বায়ুবিদ্যুৎ দশমিক ০৭ শতাংশ, সোলারে ৯ শতাংশ, জলবিদ্যুৎ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
এছাড়া ভারত থেকেও আমদানি করে সরবরাহ করা হয়েছে। আসন্ন রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে গত বুধবার বিদ্যুৎ ভবনে বৈঠক হয়। এবার সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদকরা একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না। ব্যাংক ঋণের সুদ ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতা তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। অথচ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির ধারা অনুযায়ী দীর্ঘস্থায়ী অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সঙ্কট থেকে সৃষ্ট উৎপাদন ব্যাঘাতের দায় উৎপাদকদের ওপর চাপানো চুক্তি ও আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে রমজান ও সেচ মৌসুম সামনে রেখে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতি বছর এই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বেড়ে যায়। খাত-সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, আর্থিক চাপ আরো বাড়লে অনেক ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাধ্য হয়ে উৎপাদন সীমিত করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সেচ, শিল্প এবং সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রায়। অনুমতি ছাড়াই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারতীয় ৯ কর্মকর্তার দেশত্যাগ। বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের (বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড বিআইএফপিসিএল) ভারতীয় ৯ কর্মকর্তা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই দেশ ত্যাগ করেছেন।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম ইনকিলাবকে বলেন, এলডি কর্তন দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র দেখে হয় না। নিয়মমাফিক এলডি কর্তন হলে সবার জন্যই হবে। আর বকেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ধারাবাহিকভাবে পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে।