Image description
চানখাঁরপুলে ৬ হত্যা মামলার রায় আজ

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের পাশে চানখাঁরপুল চৌরাস্তার মোড়ে অবস্থান নেয় পুলিশ। এদিন ছাত্র জনতার “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচি এবং সরকার ঘোষিত কারফিউ ছিল। অলিগলিতে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা শহীদ মিনারের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

আমার নামে একটি চাইনিজ রাইফেল ও ৪০ রাউন্ড গুলি ইস্যু করা ছিল। এ সময় এডিসি আক্তার উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের ছাত্র-জনতার উপর গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেন। আমি গুলি করতে না চাইলে, এডিসি আক্তার আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন।

তিনি বলেন, সরকারি বেতন-রেশন খাস না, গুলি করবি না কেন। পরে, এডিসি আক্তার আমার হাতে থাকা চাইনিজ রাইফেল ও ৪০ রাউন্ড গুলি কেড়ে নিয়ে কনস্টেবল সুজনের হাতে এবং সুজনের কাছে থাকা ঢাল লাঠি আমার হাতে দেয়। এ সময় কনস্টেবল সুজন, ইমাজ, নাসিরুল- মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, নাজিমউদ্দিন রোড, নবাব কাটারা, বকশিবাজার মোড়ে অবস্থানরত ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আমি পাশে দাঁড়িয়ে তাদেরকে গুলি করতে দেখি। পরে জানতে পারি সেখানে ৬/৭ জন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। এ সময় শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে জানতে পেরে আমরা শাহবাগ থানায় চলে আসি।

পরে, সুজনের কাছ থেকে আমার নামে ইস্যুকৃত অস্ত্র ও গুলি নিয়ে শাহবাগ থানায় জমা দেই। কিন্তু সুজন ১৮ রাউন্ড গুলি ফেরত দেয়ার কারণ জানতে চাইলে সে জানায়, বাকি ২২ রাউন্ড গুলি সে এডিসি আক্তারের নির্দেশে ফায়ার করেছে। এভাবেই সেদিন চানখাঁরপুলের ঘটনা বর্ণনা করে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন অজয় ঘোষ নামের পুলিশের এক কনস্টেবল।

মামলার আরেক সাক্ষী কনস্টেবল আব্দুর রহমান বলেন, ৫ই আগস্ট সকাল ৯টায় এসি ইমরুল, ইন্সপেক্টর অপারেশন আরশাদের উপস্থিতিতে শাহবাগ থানায় এডিসি আক্তার, আমিসহ ১০০ জন পুলিশ সদস্যকে ব্রিফিং করেন। সেখান থেকে শহীদ মিনারে গিয়ে আক্তারের নির্দেশে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেই।

তিনি আরও বলেন, শহীদ মিনার থেকে চানখাঁরপুল চৌরাস্তার মোড়ে গেলে আক্তার আমাদের চায়না রাইফেল দিয়ে গুলি করতে বলে। আমরা কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্য এতে রাজি না হলে সে আমাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে। পরে, অজয়ের কাছ থেকে রাইফেল নিয়ে সুজনকে দেয়। এ সময় সুজন, নাসিরুল, ইমাজ ছাত্র-জনতার উপর গুলি করে। মামলার অপর সাক্ষী পুলিশের কনস্টেবল আসিফ খানও সেদিনের ঘটনার একই রকমের বর্ণনা দিয়ে সাক্ষী দিয়েছেন। তিনিও কনস্টেবল সুজন ও নাসিরুলকে চায়না রাইফেল লোড করতে দেখেন এবং এপিবিএন সদস্য সুজন ও ইমাজকে গুলি করতে দেখেন।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর চানখাঁরপুলে ৬ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করবেন। পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি প্রথম মামলা হলেও রায় হিসেবে দ্বিতীয় রায়। রায়ের পুরো কার্যক্রম সরাসরি সমপ্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। এদিকে ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার পর আবারো সাবেক ডিএমপি কমিশনারসহ পলাতক ৪ আসামির বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন মামলাটির তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার।

মানবজমিনকে তিনি বলেন, আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেটা শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার জন্যও আবেদন করেছি। তিনি বলেন, চানখাঁরপুলে সেদিন কী হয়েছিল তা উপস্থিত ৩ পুলিশের জবানবন্দিতেও ফুটে উঠেছে। তাছাড়া মামলার সাক্ষী, এভিডেন্স ও অন্যান্য ডকুমেন্টের মাধ্যমে আমরা আসামিদের দোষ প্রমাণ করতে পেরেছি। এ মামলায় সব আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছে প্রসিকিউশন বলে উল্লেখ করেন তিনি। 

গত ২০শে এপ্রিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে আইসিটির তদন্ত সংস্থা। এই মামলায় প্রথম রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে ২০২৫ সালের ১১ই আগস্ট সাক্ষ্য দেন শাহরিয়ার খান পলাশ। তিনি নিহত শাহরিয়ার খান আনাসের বাবা। মামলায় মোট ২৬ জন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী এবং একজন আসামিপক্ষের সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকায় লক্ষাধিক বিক্ষোভকারীর মিছিলে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ষড়যন্ত্র, উস্কানি, সহায়তা ও প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের গুলি করার নির্দেশ পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে চার পুলিশ কর্মকর্তা ডিএমপি’র সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা জোনের সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আকতারুল ইসলাম ও এসি মো. ইমরুল এবং শাহবাগ থানার পরিদর্শক (অপারেশন্স) আরশাদ হোসেন মাঠ পর্যায়ের থেকে অন্য পুলিশ সদস্যদের গুলি করার নির্দেশ দেন।

চারজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের নির্দেশ পেয়েই কনস্টেবল সুজন, ইমাজ হোসেন ও নাসিরুল ইসলাম আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে ৬ জনকে হত্যা করেন। মামলায় নিহতরা হলেন, শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া। চানখাঁরপুল মামলায় মোট ৮ জন আসামি। এদের মধ্যে হাবিবুর রহমান, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইমরুল পলাতক রয়েছে। এদিকে শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন্স) আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল সুজন, ইমাজ হোসেন ও নাসিরুল ইসলাম গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।