Image description
 

জাতীয় নির্বাচনের আগে চট্টগ্রামে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা গেলেও, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন সফরের মূল তাৎপর্য আরও গভীর। দীর্ঘদিন সাংগঠনিক দুর্বলতা, মামলা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার রাজনীতিকে নতুন করে সক্রিয় করাই এই সফরের প্রধান বার্তা। ফলে এটিকে শুধু ভোট চাওয়ার কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং দলীয় ঘাঁটি পুনর্গঠনের কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবেই দেখছে বিএনপি।

চট্টগ্রাম বিএনপির রাজনীতিতে বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন এবং জাতীয় নির্বাচনে দলটির বড় সমাবেশ ও সাংগঠনিক শক্তি সবচেয়ে দৃশ্যমান ছিল এই অঞ্চলেই। নগর ও জেলার বিভিন্ন আসনে বিএনপির প্রভাব একসময় দলটিকে জাতীয় রাজনীতিতে বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছিল। সে কারণে চট্টগ্রামকে শুধু একটি জেলা নয় বরং বিএনপির রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।

তবে গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে বিএনপির সেই শক্ত অবস্থান অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, দীর্ঘ সময় প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়তা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল সংগঠনকে দুর্বল করে। মহানগর ও জেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন, গ্রুপিং ও সমন্বয়ের অভাব মাঠের রাজনীতিতে স্পষ্ট প্রভাব ফেলে। একসময় সক্রিয় কর্মসূচির জন্য পরিচিত এলাকাগুলোতেও দলীয় উপস্থিতি কমে গেছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরকে নতুন বার্তার সূচনা হিসেবে দেখছে দল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সফরের লক্ষ্য সরাসরি ভোট চাওয়ার চেয়ে বেশি করে সাংগঠনিক শক্তি ফেরানো। মাঠের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করা, নেতৃত্বে ঐক্যের বার্তা দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতির ইঙ্গিতই এখানে মুখ্য। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সরাসরি উপস্থিতি দলীয় শৃঙ্খলা ও আস্থার জায়গা শক্ত করার চেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, মহানগর বিএনপির দৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন পর বড় আকারে অনুষ্ঠিত সফরে নেতাকর্মীদের মনোভাব উজ্জীবিত, সংগঠন আরও সক্রিয় হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, মহাসমাবেশ সম্পন্ন করতে সব প্রস্তুতি সফল হয়েছে। কোনো ঘাটতি আছে কিনা আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। থাকলে সেগুলো ফিলাপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বিএনপি বিশাল সংগঠন। মতের অমিল থাকতেই পারে, তবে অমিল থাকলেও আমরা একই প্ল্যাটফর্মে কাজ করি। তারেক রহমান ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির মুখপাত্র শওকত আজম খাজা বলেন, আমরা সবাই এক হয়েছি। সবাই প্রস্তুত। পলোগ্রাউন্ডে ১০০ ফুট দীর্ঘ ও ৬০ ফুট প্রশস্ত মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দ্বিপ্তী বলেন, আমরা ১৭ বছর সংগ্রাম করেছি। বুকে ধারণ করেছি স্লোগান ‘তারেক রহমান বাংলাদেশে আসবে বীরের বেশে’। তিনি দেশে এসে ‘I have a plan, we have a plan’ কর্মসূচি দিয়েছেন জাতির সামনে। প্রায় ২০ বছর ৭ মাস পর তিনি চট্টগ্রামে আসছেন। এটি আমাদের মতো রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আনন্দের সীমা বোঝানো কঠিন। আমরা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত। আশা করি উনার মুখ থেকে চট্টগ্রামের মানুষ আগামীর পরিকল্পনা জানতে পারবেন এবং সেই পরিকল্পনা অনুসারে আমরা আগামীর বাংলাদেশের গঠন কাজ শুরু করব।

তিনি আরও বলেন, আমি নগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। তিনি সভাপতি হিসেবে আমার হাতে যে সোনালি কার্ড তুলে দিয়েছিলেন, তা আজও মনে আছে। উনি আমার নেতা, আমি উনার কর্মী। তাই আমাদের প্রত্যাশা, আবেগ, অনুভূতিটা অনেক বেশি।

দ্বিপ্তী বলেন, চট্টগ্রাম বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই শহর থেকেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং শাহাদাত বরণ করেছেন। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ারও চট্টগ্রামের সঙ্গে বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক ছিল। আমাদের নেতা তারেক রহমান, বিএনপির চেয়ারম্যান, যে চট্টগ্রামে আসছেন, তাই সবাই প্রস্তুত বরণ করার জন্য। এখানে কোনো সাংগঠনিক মনোমালিন্য নেই। সবাই ঐক্যবদ্ধ। বিশেষ করে তরুণ নেতাকর্মীদের মধ্যে এই সফর ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। আমরা একযোগে উনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করব।

চট্টগ্রাম নগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শরিফুল বলেন, শুধু বিএনপির নেতাকর্মী নয়, পুরো চট্টগ্রামবাসী উনাকে বরণ করতে প্রস্তুত। নগরীতে সবাই উৎসবমুখর পরিবেশে আছে। দেশের গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার রক্ষার দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গে এই সফরের সম্পর্ক ফুটে উঠবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।

তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম ছিল। ৫ আগস্টের পর তরুণরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে। আগামীর বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।

শরিফুল আরও জানান, তরুণদের মধ্যে নতুন করে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তারা তারেক রহমানের কাছ থেকে আশা করছে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমগ্র দেশে সুন্দর ও বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়ে উঠবে। দেশে আসার পর থেকে তারেক রহমান এই বার্তাগুলো তরুণদের মাঝে তুলে ধরেছেন, যা ৩১ দফায় সংকলিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফরের মূল লক্ষ্য কেবল ভোট চাওয়া নয় এটি দলের সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং নেতাকর্মীদের উদ্দীপনা জাগানোর উদ্যোগ। বিশেষ করে চট্টগ্রামে, যেখানে দল দীর্ঘদিন ধরে মামলা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অপ্রকাশ্য কার্যক্রমের কারণে কিছুটা স্থবির ছিল, এই সফর তাকে পুনরুজ্জীবিত করার বার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

জানা যায়, বিএনপ'র প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি পলোগ্রাউন্ডে সমাবেশে বক্তব্য রেখেছিলেন। তার মৃত্যুর পর ৯ জানুয়ারি তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ ১৪ বছর পর একই মাঠে তিনি দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে বক্তব্য দেবেন। এ ছাড়া, ২০০৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের সমর্থনে তারেক রহমান চট্টগ্রামে উপস্থিত ছিলেন। এবার দীর্ঘ ২০ বছর ৭ মাস পর চট্টগ্রামে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে এটি তার প্রথম বড় সমাবেশও হতে যাচ্ছে।