Image description

গত কয়েক দশকের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ রাজনীতিকে সামনে আনার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম তিন দিনের প্রচারণা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি এবার রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠেনি। এক্ষেত্রে বিশেষ কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে— আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনে অনুপস্থিতি। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, এবারের ত্রয়োদশ নির্বাচনে পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজন আসলে কোন ইস্যু বা ভিত্তির ওপর দাঁড়াচ্ছে?

প্রধান তিন দল— বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—পরস্পরের সমালোচনা না করে জনগণের সামনে নিজেদের এজেন্ডা উপস্থাপন করার কথা বারবার বললেও এবারের নির্বাচনি প্রচারণায় তারা ‘সংস্কার’, ‘ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসন’ এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের মতো ইস্যুকে ধরে একে অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক ও ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছে।

তবে মুক্তিযুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে আলোচনা থেকে বাদ পড়েছে বলেও এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। নির্বাচনি প্রচারণার প্রথম দিনেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেটের একাধিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সেদিন সরাসরি না হলেও তিনি জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন।

মৌলভীবাজারের শেরপুরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি সমাবেশে তিনি বলেন, "আরে ভাই, আপনাদের তো মানুষ একাত্তরে দেখেছে, ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। একাত্তরে মানুষ দেখেছে আপনারা কীভাবে দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।"

এছাড়া, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রচারণার দ্বিতীয় দিনেই বলেন, “আগামীতে সুযোগ পেলে দেশ সেবা করার পাশাপাশি শহীদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা ও একাত্তরের বীরদের ঋণ শোধ করা হবে।”

তবে এর বাইরে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু কী হতে পারে, তা ইতোমধ্যেই চিহ্নিত করেছেন এনসিপির সদস্যসচিব এবং রংপুর–৪ আসনে দলটির প্রার্থী আখতার হোসেন। নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি বলেন, একটি পক্ষ সংস্কার ও বিচার চায়, আরেকটি পক্ষ সংস্কার ও বিচার চায় না।

আখতার হোসেনের ভাষ্য, একটি পক্ষ দুর্নীতিমুক্ত ও আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চায়, আরেকটি পক্ষ বাংলাদেশকে গোলামির দিকে ঠেলে দিতে চায়। এখন বাংলাদেশের জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তারা কোন বাংলাদেশের পক্ষে থাকবে; গোলামি নাকি আজাদি।

বিএনপির প্রতি নতুনদের এত ক্ষোভ কেন

জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের উদ্যোগে গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পর বিএনপির বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে বেশ সমালোচনাও চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি বলা হচ্ছে, নির্বাচনে জয়লাভের লক্ষ্যে নতুন নেতৃত্ব আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়ার কৌশল নিচ্ছে।

এনসিপির নেতাদের বক্তব্যে বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধেও সরাসরি সমালোচনা উঠে আসছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির দিকে ইঙ্গিত করে এনসিপি আহ্বায়ক এবং ঢাকা–১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদির নামে এক ধরনের ভোট কেনার প্রক্রিয়া, এক ধরনের কৌশল তারা অবলম্বন করছে। কিন্তু মানুষ আসলে এতে অত সাড়া দিচ্ছে না। মানুষ এগুলো বিশ্বাসও করছে না।”

নাহিদ ইসলামের দাবি, মানুষ আগেও বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি শুনেছে। সে কারণেই এসব প্রতিশ্রুতিকে তিনি ভোট কেনার কৌশল হিসেবেই দেখছেন।

ঢাকা–৮ আসনে ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের মনোনীত প্রার্থী ও এনসিপি মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার নির্বাচনি প্রচারণায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি ভারতের আধিপত্যবাদের প্রতি বিএপির আনুগত্যের ইঙ্গিত করেন।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আমরা শেখ হাসিনার বিচার করতে পারিনি। দিল্লি তাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। মুজিববাদী সংবিধানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা কায়েম ছিল, সেটি পুনর্বহাল রাখতে তারা এখন ক্যাম্পেইন শুরু করেছে।”

তিনি আরও বলেন, “ধর্মীয় রাজনীতি শুরু করা হয়েছে। সিলেটের মাজারে দোয়া নিয়ে যদি ধর্মীয় উসকানিমূলক কথা বলা হয়, এগুলো বাংলাদেশে নতুন সভ্য রাজনৈতিক ভাষা হতে পারে না।”

তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল লন্ডন থেকে মোয়া আসবে— সুস্বাদু মোয়া। সেই মোয়া বাংলাদেশে নেমেছে। এই মোয়া এত বিশ্রী!”

ভারতের প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির এই নেতা বলেন, “ভারতের কাছে শেল্টার নিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে। সেই ভয়কে ব্যালট রেভুলেশনের মাধ্যমে জয় করতে হবে।”

এদিকে, বিএনপির প্রতি এনসিপির এমন ক্ষোভের কারণ জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, “এটা তারা ভালো বলতে পারবে। তারা যে লড়াই করেছেন, আমরাও সে লড়াইয়ে ছিলাম। সবচেয়ে বেশি শহীদ হয়েছে আমাদের দলের।”

তিনি আরও বলেন, “এই মুহূর্তে তারা আমাদের নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বী। পরস্পরের সমালোচনা হবেই। তবে মনে রাখতে হবে, আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ— শত্রু নই। ব্যক্তিগত আক্রমণ অরাজনৈতিক।”

তরুণদের জন্য সবারই নানা অফার

বাংলাদেশের প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটিই তরুণ। নির্বাচনি লড়াইয়ে তাদের গুরুত্ব থাকাটাই স্বাভাবিক। সেই গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে জুলাই আন্দোলন, যার নেতৃত্বে ছিলেন তরুণেরা। এই দুই বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হার–জিত নির্ধারণে তরুণ ও নতুন ভোটাররাই বড় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে তরুণ ও যুব ভোটারদের উদ্দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তরুণদের উদ্দেশে বলেন, “যুবকদের কথা দিচ্ছি— আল্লাহ তৌফিক দিলে তোমাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ আমরা গড়বো, ইনশাআল্লাহ। এই সমাজের চাবি ও নেতৃত্ব তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে আমরা পেছন থেকে তোমাদের শক্তি ও সাহস জোগাব। তোমাদের সমর্থন ও ভালোবাসা দিয়ে যাবো।”

প্রবাসী তরুণদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অদক্ষ অবস্থায় বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, প্রবাসীরা যদি সঠিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠান, তাহলে তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।

জামায়াতের আমির আরও বলেন, “আমরা কাউকে ভাতার লোভ দেখিয়ে ভোট চাই না। কাজ দিয়ে দেশকে বেকারমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিতে চাই। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বেকার যুবক-যুবতীদের কাজের ব্যবস্থা করা হবে।”

জামায়াতের মুখে আওয়ামী লীগের সমালোচনাই বেশি

নির্বাচনি প্রচারণার শুরু থেকেই জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে আওয়ামী লীগের দুর্নীতি, ভোট ডাকাতি এবং ‘ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন’-এর আশঙ্কা। নানা ইঙ্গিত ও রূপকে জামায়াতের প্রচারণায় আওয়ামী লীগের উপস্থিতি স্পষ্টভাবেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে একাধিক জনসভায় দাবি করেছে, ভোট ডাকাতির কারণে গত ১৭ বছর দেশের মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। দলটির নেতাদের ভাষ্য, জনগণ আর নতুন কোনও ভোট ডাকাত দেখতে চায় না। একইসঙ্গে তারা বলছেন, এই দেশে ফ্যাসিবাদের ছায়াও মানুষ দেখতে চায় না।

উত্তরবঙ্গে শনিবার প্রচারণা চালানোর সময় জনসভায় জামায়াতের শীর্ষ নেতা বলেন, “ফ্যাসিবাদ যদি নতুন কোনও জামা পরে আবার সামনে আসে, তাহলে পাঁচই আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদেরও সেই একই পরিণতি হবে।”

তিনি আরও বলেন, “মাঝে মাঝে আকাশে শকুনের ছায়া দেখা যায়। সেই শকুনের ছায়া যেন বাংলাদেশে না পড়ে—এ বিষয়ে সবাইকে সাবধান থাকতে হবে।”

তিনি অভিযোগ করেন, পরপর তিনটি নির্বাচনে দেশের যুব সমাজ ও সাধারণ মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি।

একই জনসভায় তিনি বলেন, “শহীদদের সম্মান জানাতে, বাংলাদেশের বস্তাপচা অতীতের ৫৪ বছরের ব্যবস্থাকে— যেখানে শাসকরা দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, খুনি, ধর্ষক এবং আয়নাঘরের নায়ক–নায়িকা তৈরি করেছে— সেই ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমরা ১২ তারিখ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবো।”

জামায়াতের এই নেতা জনসভায় বিগত সরকারের ‘১০ টাকা কেজি দরে চাল’ খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতিরও কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “জনগণ আর কোনও ধোঁকা দেখতে চায় না।”

প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ‘ভারত কার্ড’

২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত স্লোগানগুলোর একটি—“দিল্লি না ঢাকা”। সেই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক প্রচারণায় ভারতবিরোধী অবস্থান আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের “আধিপত্যবাদী ভূমিকা” নিয়ে অভিযোগ বারবার উঠে আসছে এবং নির্বাচনি প্রচারণার শুরু থেকেই এই ইস্যুকে প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপরীতে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে।

প্রচারণা শুরুর দিনই কুমিল্লায় এক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দাবি করেন, ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে— প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধান ভারতের সঙ্গে তিনটি শর্তে চুক্তি করেছেন। তাহেরের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তিনটি শর্ত হলো— প্রথমত, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র কিনতে হলে ভারতের অনুমতি নিতে হবে এবং ভারতের অনুমতি ছাড়া কোনও অস্ত্র কেনা যাবে না। তৃতীয়ত, দেশে ইসলামপন্থি দলগুলোকে দমন করতে হবে।

জামায়াত নেতার বক্তব্যে আরও বলা হয়, ওই প্রতিবেদনের বিষয়ে বিএনপি কোনও প্রতিবাদ জানায়নি। এর মাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের সঙ্গে বিএনপি চুক্তি করেছে।

জামায়াত নেতার এমন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদি আমিন। তিনি বলেন, “সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই বিএনপির রাজনীতি।” একইসঙ্গে তিনি জানান, বিএনপি কখনও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপস করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।