Image description
 

ভারতের ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলার বরাঙ্গা গ্রামে সারান্ডা জঙ্গলের গভীরে অবস্থিত উৎক্রমিত উচ্চ বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক গুলশান লোহার (৩৯)। জন্ম থেকেই হাতহীন এই শিক্ষক গত ১১ বছর ধরে পায়ের আঙুলের ফাঁকে চক ধরে ব্ল্যাকবোর্ডে গণিতের জটিল সমস্যা সমাধান করে শিক্ষার্থীদের পাঠ দিচ্ছেন। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও নিষ্ঠা এলাকার মানুষের কাছে এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন মতে, বরাঙ্গা গ্রাম সারান্ডা জঙ্গলের অভ্যন্তরে অবস্থিত। সেখানে অবকাঠামোর অভাব, দুর্গম পথ ও অতীতের অশান্তির কারণে শিক্ষকরা সাধারণত যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। মৌলিক সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও গুলশান প্রতিদিন অটল মনোবল নিয়ে ক্লাসে উপস্থিত হন। তার শিক্ষাদানের ধরন দেখে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘গুলশান স্যার খুব ভালো করে পড়ান। তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো পড়ানোতে প্রভাব ফেলে না। ধারণা খুব স্পষ্ট এবং বারবার প্রশ্ন করলেও বিরক্ত হন না।’

গুলশান সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। জন্মের পর তার মা এক সপ্তাহ বুকের দুধ না দিলেও পরবর্তীতে মা-ই তাকে পায়ে লেখার অনুশীলন করিয়েছেন। স্কুল শেষ করে চক্রধরপুর থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে ট্রেনে যাতায়াত করে বিএড ও এমএড সম্পন্ন করেন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি তৎকালীন ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাকরির জন্য আবেদন করেন। স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়া লিমিটেডের (সেল) সহায়তায় ২০১১ সালে বরাঙ্গা উত্ক্রমিত উচ্চ বিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক গণিত শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তবে স্থায়ী সরকারি চাকরি না পাওয়ায় তিনি এখনো আক্ষেপ করেন। তবে স্থায়ী চাকরির জন্য টিচার এলিজিবিলিটি টেস্টের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

 

তার স্ত্রী অঞ্জলি ও ছোট মেয়ে তার সবচেয়ে বড় সমর্থক। অঞ্জলি বলেন, “তিনি আমাদের পরিবার ও সম্পূর্ণ সম্প্রদায়ের মেরুদণ্ড। প্রতিদিন শিশুরা তাকে পড়াতে দেখে অনুপ্রাণিত হয়।”

 
 

সহকর্মী সুনীতা কান্থ বলেন, “গুলশান স্যারের সাধারণ স্বাস্থ্য আমাদের মতো নয়, কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি আমাদের শিক্ষক ও সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তার কাছ থেকে সবসময় কিছু না কিছু শেখার আছে।”

 

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজীব শঙ্কর মাহতো বলেন, “গুলশান লোহার দেখিয়েছেন যে, দৃঢ়সংকল্প থাকলে প্রতিকূলতা জয় করা যায় এবং সম্মানজনক জীবন যাপন করা সম্ভব। তিনি শিশুদের দেখিয়েছেন যে, স্বপ্ন অসম্ভব নয় যদি অধ্যবসায় থাকে।”

গ্রামবাসী তাকে ‘অনুপ্রেরণার স্তম্ভ’ বলে অভিহিত করেন। গ্রামের এক বয়োজ্যেষ্ঠ দশরথ মাহতো বলেন, “গুলশান লোহার আমাদের কাছে শুধু শিক্ষক নন, তিনি আমাদের গর্ব। তার যাত্রা আমাদের শেখায় যে কষ্ট যতই হোক না কেন উচ্চ লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়।”

গুলশানের একমাত্র লক্ষ্য, “প্রতিবন্ধকতা কাউকে স্বপ্ন পূরণে বাধা দিতে পারে না। আমার দুর্বলতা এখন আমার শক্তি। প্রত্যেক শিশু যেন শিক্ষিত হয় এবং স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারে।”

দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষার ঘাটতি পূরণে ফিরে এসে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সত্যিকারের শিক্ষক যে কোনো পরিস্থিতিতে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য কাজ করেন। তার এই যাত্রা ঝাড়খণ্ডের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের জন্য নীতি পর্যালোচনা ও স্বীকৃতির দাবি তুলেছে।