আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্রমেই সাম্প্রতিক সময়ের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহির প্রতীক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়। যেখানে যুদ্ধকালীন অপরাধের পাশাপাশি আধুনিক সময়ের রাষ্ট্রীয় সহিংসতাও একই আইনি কাঠামোয় বিচারাধীন হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন শুধু অতীতের দায় নিরূপণের প্রতিষ্ঠান নয়। বরং বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রসঙ্গত: সময় বদলালেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম থেমে নেই। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ বিচারের মধ্য দিয়ে যে বিচারিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে।
ক্ষমতার পট পরিবর্তনের ট্রাইব্যুনালে চলমান উল্লেখযোগ্য মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে-
শেখ হাসিনা, জয় ও পলকের বিচার
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন ও নাগরিক অধিকার হরণের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে ব্যবহার করা হয় এবং এতে বহু নিরস্ত্র নাগরিক নিহত ও আহত হন। এসব কর্মকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যা আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে।
এই মামলাগুলোকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বলা হচ্ছে কয়েকটি কারণে—
প্রথমত, এতে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের নাম এসেছে।
দ্বিতীয়ত, এটি দেখিয়েছে যে ট্রাইব্যুনালের বিচার কেবল যুদ্ধকালীন অপরাধেই সীমাবদ্ধ নয়।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের দায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব পর্যন্ত গড়ালে কীভাবে বিচার হতে পারে। তার একটি নজির তৈরি হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালে এসব মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ, নথিপত্র উপস্থাপন এবং ফরেনসিক প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম এগোচ্ছে।
ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ নেতাদের বিচার
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার শুরু হয়েছে।
এই মামলাগুলোতে মূল অভিযোগ হলো—রাজনৈতিক ক্ষমতার আশ্রয়ে সংগঠিত সহিংসতা, আন্দোলন দমন, বিরোধী মতের ওপর পরিকল্পিত হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে নির্যাতন চালানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মামলার গুরুত্ব এখানেই যে—
এটি রাজনৈতিক সংগঠনের কাঠামোর ভেতরে সংঘটিত সহিংসতার দায় নিরূপণ করছে।
কেবল ব্যক্তি নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার দায়ও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের জন্য এটি একটি বড় বার্তা। সহিংসতার দায় এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
এগুলো শুধু ব্যক্তি বিচারের মামলা নয়। বরং রাষ্ট্র ও রাজনীতির সম্পর্কের নতুন ব্যাখ্যা হাজির করছে।
কল্যাণপুর ‘জঙ্গি নাটক’ মামলা
রাজধানীর কল্যাণপুরে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে নয় তরুণ হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের মানবাধিকার ইতিহাসে একটি ভয়াবহ অধ্যায়। অভিযোগ রয়েছে ওই অভিযান পরিকল্পিত ছিল এবং প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করে ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
এ ঘটনায় সাবেক আইজিপিসহ নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:
– নিহতরা আত্মসমর্পণের সুযোগ পাননি
– অভিযানের আগে ও পরে তথ্য গোপন করা হয়েছে
– বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে
এসব মামলা গুরুত্বপূর্ণ কারণ:
– এটি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিচারিক পর্যালোচনা করছে
– ‘ক্রসফায়ার’ সংস্কৃতির দায় নিরূপণ করছে
– রাষ্ট্রীয় সহিংসতার দায় ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও নির্ধারণের চেষ্টা করছে
‘আয়নাঘর’ ও গুম সংক্রান্ত মামলা
র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল (টিএফআই) এবং কথিত ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালাকে ঘিরে গুম, নির্যাতন ও অবৈধ আটক রাখার অভিযোগে সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
মামলাগুলোর মূল অভিযোগ:
– রাজনৈতিক কর্মী ও বিরোধী মতাবলম্বীদের গুম
– গোপন স্থানে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন
– পরিবারকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা কোনো তথ্যই না দেওয়া
এই বিচার প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্ধকার দিককে আইনের আলোয় আনছে। এটি দেখাচ্ছে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতেও মানবাধিকার লঙ্ঘন বৈধ হতে পারে না।