Image description

জামায়াতের বন্ধু হতে চায় যুক্তরাষ্ট্র-ওয়াশিংটন পোস্টের এমন একটি রিপোর্ট নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় চলছে। গেলো ডিসেম্বরে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তার অফ দ্যা রেকর্ড আলাপের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে রিপোর্টটি। অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ঐ মার্কিন কূটনীতিকের পুরো অডিও ও বক্তব্যটি প্রকাশ করেন।

আরটিএনএনের পাঠকদের জন্য তার অনুবাদ প্রকাশ করা হলো:

কূটনীতিকের বক্তব্য: বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে, আইজি (IG) মহলের মানুষরা ইউনূসকে বিশ্বাসযোগ্য একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করায় একটি বড় আস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে মানুষ আবারও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে শুরু করে। আর তৈরি পোশাক (RMG) খাত এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যায়নি।

আমি অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর লোকজনের কাছ থেকে শুনেছি—শ্রীলঙ্কা এমন পরিস্থিতিতে হলে কখনোই টিকে থাকতে পারত না। তাই অনেক কিছুই ঠিকঠাকভাবে হয়েছে, বিশেষ করে অর্থনীতির সামগ্রিক (ম্যাক্রো) ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই ভালো। আমার মনে হয়, হাসিনার দণ্ডাদেশটি রাজনৈতিকভাবে ছিল একদম মেধাবী চাল—অবিশ্বাস্য যে তারা ক্ষমতা ছাড়ার আগেই এই সিদ্ধান্ত আদায় করে নিতে পেরেছিল।

আর আমরা স্বীকার করি, আইসিটিতে মুক্ত ও ন্যায্য বিচার ছিল না, ইত্যাদি। কিন্তু তিনি (শেখ হাসিনা) দোষী ছিলেন এবং সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। আর তারা নিজেদের ম্যান্ডেটের ভেতর থেকেই কাজটি করেছে—যা ছিল বেশ চমকপ্রদ।

ছাত্ররা যখন কোনো কার্যকর রাজনৈতিক দল গঠন করতে ব্যর্থ হলো, তখন বিএনপিকে যেভাবে ইউনূস সামলেছেন, সেটাও ছিল অসাধারণ। তার লন্ডনে যাওয়া এবং তারেকের সঙ্গে আলোচনা—এটা ছিল এমন এক রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়, যা আমরা কেউই তখন তার মধ্যে আছে বলে ভাবিনি।

অনেক সময়ই এমন হয়েছে, যখন তার সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখে সব রাজনৈতিক দলকেই হুমকি মনে হয়েছে। কিন্তু তিনি সেনাবাহিনীর কাছে মাথা নত করেননি। সবকিছু ঘটার পরও তিনি অলিগার্কদের কাছে নত হননি, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও না।

হ্যাঁ, অনেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে যেভাবে তিনি সামলেছেন, তার সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন—এটা তোমাদের সমস্যা, ওটা তোমাদের সমস্যা। তোমাদের নিজেদের মধ্যে কথা বলতে হবে। এখন দলগুলো নিজেদের মধ্যেই কথা বলছে। জামায়াত ও বিএনপি একে অপরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে—বিশেষ করে অর্থনীতির বিষয়গুলো নিয়ে। শেষ দিকে যে সংস্কারগুলো আনা হচ্ছে, সেগুলোও এর অংশ।

জুলাই সনদ ও এই গণভোট পুরো ব্যবস্থাপনাটাই—আমরা সমালোচনা করতে পারি, কে গণভোট বুঝবে বা না বুঝবে, এসব কথা বলা যায়। কিন্তু নির্বাচনের দিনেই এই গণভোটের ব্যবস্থাপনাটা বাস্তবায়িত হবে।

তিনি মূলত বলেছেন—চুপ করে থাকো এবং বিএনপি এমন অনেক কিছু মেনে নেবে, যেগুলোতে তারা একমত ছিল না। নতুবা তোমরা সবাই এখান থেকে সরে যেতে পারো। কিন্তু তারা সরে যায়নি। তাই আমরা যেটা বুঝেছি, তা হলো—বাংলাদেশে সামাজিক সংহতির একটি বিশাল অদৃশ্য শক্তি রয়েছে।

৫ আগস্ট থেকে শুরু করে যতবারই আমরা ভেবেছি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, ততবারই তা হয়নি। ৫ আগস্ট আমরা দেশ ছেড়েছিলাম। আজ সকালেও আমাদের একটি বৈঠক হয়েছে, যেখানে এসব আলোচনা হয়েছে। এক মাস পর আমরা ওয়াশিংটনে ফিরে বলেছিলাম—না, সবাই আবার ফিরে আসতে পারে। তখন তারা বলেছিল, “তোমরা পাগল নাকি? এটা সম্ভব না।”

আমাদের বোঝাতে হয়েছিল যে, বাংলাদেশি সমাজ আবারও স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে এবং সরকার ছাড়াই শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে।

আমি মনে করি, তোমরা নিজেরাই যথেষ্ট কৃতিত্ব দাও না—যে কারণে বারবার এমনটা সম্ভব হচ্ছে। এটা কোনো দল বা সরকার নয়, বরং জনগণই। দলগুলো বারবার সংঘাত থেকে সরে আসছে।

এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়া আইন চাপিয়ে দিতে পারবে। সম্প্রতি ক্যাথলিক চার্চের একজনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, “জামায়াত জিতলে তারা স্যাক্রেড হার্ট ও সব ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়করণ করবে এবং ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় বানাবে।”

এটা বাস্তব নয়। যদি জামায়াত বাংলাদেশে সব ক্যাথলিক স্কুল দখল করে নেয়, তাহলে পরদিনই তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক সমাজ কখনোই এটা মেনে নেবে না এবং বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির সুযোগ দেবে না।

আরেকটা বিষয় হলো—বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে যায়, যা নির্ভর করে সামাজিকভাবে উদার পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর ওপর। এই ব্র্যান্ডগুলোর কারণেই বাংলাদেশের কারখানাগুলো আজ বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও নিরাপদগুলোর মধ্যে রয়েছে। এই রপ্তানি খাত নারীদের ওপর নির্ভরশীল।

যদি বাংলাদেশে নারীদের কাজের সময় সীমিত করে দেওয়া হয় বা শরিয়া আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কোনো অর্ডারই আর থাকবে না। আর অর্ডার না থাকলে বাংলাদেশি অর্থনীতি থাকবে না। জামায়াত এটা করবে না, কারণ তারা বোকা না। এখানে খুব বেশি শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মানুষ আছে।

আমরা তাদের খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দেব, এর পরিণতি কী হবে। ইউরোপীয়রাও একইভাবে জানিয়ে দেবে। সৌদি আরব এক জিনিস, আর বাংলাদেশ আরেক জিনিস—বাংলাদেশ সৌদি আরব হয়ে উঠতে পারে না।

জামায়াত বিষয়ে আমাদের অবস্থান হলো—আমরা জামায়াতের সঙ্গে কথা বলব, হেফাজতের সঙ্গে কথা বলব, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গেও কথা বলব। আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক, যাতে প্রয়োজনে ফোন তুলে বলতে পারি—“এই কথাটা আপনি বললেন কেন?”

এভাবেই বিষয়টা এগোবে। কারণ তারা বোকা না, তারা পাগলও না। এর মানে এই না যে আমরা সবকিছু রক্ষা করতে পারব বা কিছুই বদলাবে না। এই লড়াই মূলত তোমাদেরই। তাই ওই দিকের নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা বুঝি, এটা কঠিন। আমরাও কথা বলি। তোমরাও কথা বলো। তারা প্রায়ই একই পাঁচটা কথা বারবার বলে। আমরা চাই এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে। জামায়াতের যে সংস্কারপন্থী অংশ—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা জিতেছে—তাদের সঙ্গে কি কথা বলা যায়? তারা কি তোমাদের শোতে আসবে?

আমরা কেবল যোগাযোগ ও সংলাপের পথ খুঁজছি। কারণ পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটা বাংলাদেশের মানুষই নিয়েছে। একটা পরিবর্তন হয়েছে—মানুষ ইসলামপন্থার দিকে ঝুঁকেছে।

যদি নির্বাচনের ফল অন্যরকম হয়, দারুণ। তখন তোমাদের একমাত্র সমস্যা হবে বিএনপি নিজেরাই নিজেদের দুর্নীতি আর অন্তর্দ্বন্দ্বে ধ্বংস করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জামায়াত সম্ভবত তাদের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো করবে। তারা টেবিলে থাকবে, এবং সেটা সহজ হবে না।

তবু আমি মনে করি না যে সম্পূর্ণ আতঙ্ক ছড়ানোটা সহায়ক। কারণ কিছু সীমারেখা আছে—তারা একটা নির্দিষ্ট সীমার বেশি যেতে পারবে না। বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরশীল।

তোমরা যদি সবকিছু চীনে বিক্রি করতে, তাহলে বড় সমস্যায় পড়তে—কারণ তারা এসব নিয়ে মাথাই ঘামাত না। কিন্তু তা নয়। তোমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেই বিক্রি করো।

এমনকি যদি আমাদের সরকার এসব নিয়ে খুব একটা না-ও ভাবে, আমাদের ভোক্তারা ভাবে, আমাদের কোম্পানিগুলো ভাবে। তারা নিজেদের সুনাম নিয়ে চিন্তা করে। এই বিষয়গুলো তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমি বুঝতে পারি।