ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশজুড়ে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। গতকাল মধ্যরাতে ব্যালট পেপার ছাপা শুরু হয়েছে। ১ হাজার ৯৭২ প্রার্থীর মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের পর আজ থেকেই তারা পুরোদমে প্রচারে নামছেন। তবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখতে নির্বাচনী আচরণবিধির কঠোর বাস্তবায়ন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশন এবার ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’ সংশোধন করে বেশ কিছু কঠোর নিয়ম যুক্ত করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—নির্বাচনী প্রচারে কাগজের পোস্টার ও ড্রোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা। এ ছাড়া পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক বা পিভিসি ব্যানার ব্যবহারেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, যার বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ নয়। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল প্রচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, গুজব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার আশঙ্কাও করছে কমিশন, যা জনমনে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। তবে ইসি জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য বা ব্যক্তিগত আক্রমণ ঠেকাতে সাইবার মনিটরিং সেল সক্রিয় রাখা হয়েছে।
নির্বাচনী আইন আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অনুযায়ী, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা, জরিমানা, কারণ দর্শানোর নোটিশ, মুচলেকা, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিল বা নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত করারও বিধান রয়েছে। মাঠপর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনী মাঠে মূল লড়াইয়ে থাকা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ অধিকাংশ দলই একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ তৈরির দাবি জানিয়েছে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির প্রার্থীদের ওপর হামলা ও প্রচারে বাধার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন জায়গায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে ডিজিটাল বিলবোর্ড ও ব্যানার অপসারণের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশন এবার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, এবার কোনো শোকজ নয়, সরাসরি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতেও আমরা দ্বিধা করব না।
এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে আচরণবিধি তদারকির জন্য প্রতিটি উপজেলায় দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচারিক কমিটি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে তলব করা হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, প্রচার শুরুর প্রথম দিনে বৃহস্পতিবার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেবেন। সড়কপথে ঢাকায় আসতে তিনি মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি জেলায় সাতটি জনসভায় বক্তৃতা করবেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান নিজ নির্বাচনী আসন ঢাকা-১৫-এর মিরপুর-১০ নম্বরে প্রথম নির্বাচনী জনসভা করবেন। এরপর তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় নির্বাচনী প্রচার চালাতে যাবেন। তিন নেতার মাজার (শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম) ও ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। একইভাবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন।
তবে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগেই এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অনেক প্রার্থীকে শোকজ, তলব এবং কোথাও কোথাও জরিমানা ও মুচলেকার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর পরও থামেনি লঙ্ঘনের মহোৎসব। এ ব্যাপারে গত মঙ্গলবার জামায়াত, এনসিপিসহ ৪ দলকে সতর্ক করেছে ইসি। বিএনপির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামীর আমির, খেলাফত মজলিসের আমির, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ককে সতর্ক করে চিঠি পাঠায় ইসি।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুরু থেকেই নির্বাচনী আচরণবিধি উপেক্ষা করে প্রচারের ধরন বহুমাত্রিক। মিলাদ, দোয়া মাহফিল, শোকসভা, স্মরণসভাসহ নানা উপায়ে গত বেশ কয়েকদিন ধরে চলেছে মূলত নির্বাচনি প্রচার। কোথাও বিশাল বিলবোর্ডে প্রার্থীর ছবি ও স্লোগান, কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ বা পোস্টার, আবার কোথাও ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানের আড়ালে ভোট চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে প্রতীক বরাদ্দের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা। বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, আচরণবিধি মেনেই এখানে এসেছি। দুঃখজনক হলো, একটি বিশেষ দল আচরণবিধি মানেনি। আমরা পাঁচজন এসেছি, তারা ১০ জনের বেশি লোক এখানে নিয়ে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে একটি দল নারীদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। ভিডিওতে দেখা গেছে, নারীকর্মীরা এনআইডি ও বিকাশ নম্বর চাইছিল। এগুলো ব্যক্তিগত তথ্য।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় মানুষরা জিজ্ঞাসা করলে জামায়াতের সংঘবদ্ধ কর্মীরা বিএনপির দুজন কর্মীকে মারধর করেন। সেখানে পরে হৈ-হল্লা সৃষ্টি হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে ফোন দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনুরোধ করি।
জামায়াত আমিরের পক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে প্রতীক বরাদ্দ নেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় তিনি বলেন, আশা করি সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাব। যদিও আমাদের ওপর সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে। গতকালও করেছে। আশা করব, এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে। সন্ত্রাসমুক্ত নির্বাচন আশা করি। যেহেতু গত তিনটি নির্বাচন হয়নি, তাই ইসিকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
নারীদের দিয়ে আগাম প্রচারণার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা পুরোপুরি অসত্য তথ্য। তপশিল ঘোষণার পর সব প্রচারণা সামগ্রী আমরা অপসারণ করেছি, ইসির অপেক্ষা করিনি। অপপ্রচার চালিয়ে ১০ দলীয় ঐক্য বিনষ্টের চেষ্টা চালাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষপাতমূলক আচরণ হচ্ছে—ইসির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।
তিনি আরও বলেন, একটি বিশেষ দল থেকে আমাদের নারী ভোটারদের ওপর সন্ত্রাসী লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আশা করছি দ্বিতীয়বার যেন এমনটা না ঘটে।
এদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনূচ আলী প্রার্থীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কোনো কর্মীও যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন, তার দায় প্রার্থীর ওপর বর্তাবে। তাই সবাইকে সতর্ক থেকে ভোটের প্রচার চালাতে হবে।
সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাহিদ ইসলাম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে প্রতীক বরাদ্দের আগেই ‘গণভোটে হ্যাঁ’ স্লোগান সংবলিত বিলবোর্ড টানানোর অভিযোগে ইসি শোকজ নোটিশ দেয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় আলোচনার ঝড় ওঠে। নির্বাচনী সমাবেশ বন্ধ করতে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে অশোভন আচরণ ও হুমকির অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, জামালপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতীক বরাদ্দের আগেই ভোট চাওয়া, শোডাউন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টার প্রচার এবং বিলবোর্ড টানানোর অভিযোগে একের পর এক প্রার্থীকে শোকজ করেছে নির্বাচন কমিশনের অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি।
এ তালিকায় ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ছাড়াও রয়েছেন একাধিক আলোচিত প্রার্থী। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিনের শোডাউনের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করেন ও মুচলেকা নেন। চাঁদপুরে জামায়াত ও বিএনপির দুই প্রার্থী ফেসবুকে প্রচার চালিয়ে পরে আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলে অব্যাহতি পান।
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরকে প্রতীক বরাদ্দের আগেই ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের পক্ষে সভা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানোর অভিযোগে তলব করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপির জসীম উদ্দীন আহমেদকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাওয়ার অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিনের বিরুদ্ধেও শোডাউন ও আগাম প্রচারের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করেন ও মুচলেকা নেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম-২ আসনে অধ্যক্ষ নুরুল আমিন, জামালপুর-২ আসনে ছামিউল হক ফারুকী ও চাঁদপুর-৪ আসনে মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজী। যাদের আগাম প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টারের মাধ্যমে ভোট চাওয়ার অভিযোগে শোকজ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে অব্যাহতি পেলেও এসব ঘটনায় কমিশনের কঠোর নজরদারির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
সিলেট-৫ আসনে বিএনপি-সমর্থিত জোট জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুকের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ ও ভোট চাওয়ার অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে। জামালপুর, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনে বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক প্রার্থীকে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটিগুলো।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেখানে প্রার্থীর সংখ্যাও অনেক বেশি। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগেই যেভাবে আচরণবিধি ভঙ্গের প্রতিযোগিতা হয়েছে, তাতে প্রচার শুরুর পর কী হতে পারে, তা নিয়ে বেশ শঙ্কা রয়েছে। প্রায় দুই হাজার প্রার্থী মাঠে থাকায় প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি এবং আচরণবিধি ভঙ্গের প্রবণতা বাড়ার সম্ভাবনাও প্রবল। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা, নির্বাচন কমিশনের কঠোর মনোভাব এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তৎপরতাই পারবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে।
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের নির্বাচনী পরিচালক ড. আব্দুল আলিম কালবেলাকে বলেন, প্রচার শুরুর আগেই বিভিন্ন সময় আচরণবিধি ভঙ্গের নানা অভিযোগ ওঠে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ যদি দৃশ্যমান না হয়, তাহলে আচরণবিধি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। সেজন্য কমিশনকে খুব শক্ত হাতে আচরণবিধি পালনে প্রার্থীদের বাধ্য করতে হবে।