Image description

আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা, দুদকের আবেদন এবং চলমান তদন্ত—সবকিছু উপেক্ষা করেই বিদেশে বসে ই-পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুই সন্তান। দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকা অবস্থায় দুবাইয়ের বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল থেকে জাবেদের কন্যা জেবা জামান ও পুত্র তানয়ীম জামান চৌধুরীর ই-পাসপোর্ট ইস্যু ও সরবরাহের ঘটনায় প্রশাসনিক সমন্বয়, আইনগত যাচাই এবং কনস্যুলেটের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জাবেদ সপরিবারে বর্তমানে আরব আমিরাতে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুজনই দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল থেকে ৪৮ পৃষ্ঠার ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন। অথচ আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। অন্যদিকে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরেক ছেলে সাদাকাত জামানের পাসপোর্ট আবেদন (এনরোলমেন্ট আইডি: ৫০০২০০০৩৩৪৩১০) আপাতত আটকে আছে।

ঠিকানা চান্দগাঁওয়ের, আবেদন দুবাইয়ে

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেবা জামান দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল থেকে যে ই-পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন, তার নম্বর এ১৫৯০০৯** (শেষ দুটি সংখ্যা গোপন)। পাসপোর্টটি অর্ডিনারি ক্যাটাগরির, ৪৮ পৃষ্ঠার এবং এর মেয়াদ ২০৩৪ সালের ২৮ মে পর্যন্ত। এতে ইস্যু তারিখ উল্লেখ রয়েছে ২০২৪ সালের ২৯ মে। জেবার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৮২৬৪৫৩১০**।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর একমাত্র কন্যা জেবা জামান বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করছেন। তিনি ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশি পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর জন্য দুবাইয়ের বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলে আবেদন করেন। কনস্যুলেট সূত্র অনুযায়ী, তার আবেদন গ্রহণ করে বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন করা হয় এবং তার অনুকূলে একটি পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট আইডি (৫০০২০০০৩৩৪৩১০) ইস্যু করা হয়।

আবেদনপত্রে জেবা জামান বর্তমান ঠিকানা হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঠিকানার পরিবর্তে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকার একটি ঠিকানা উল্লেখ করেন। তা সত্ত্বেও আবেদনটি গ্রহণ করা হয় এবং কনস্যুলেটে তার বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন করা হয়।

এর আগে জেবা জামান ২০২০ সালের ৮ জুলাই একটি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছিলেন, যার নম্বর ছিল ইজি০১৪৮২**। ওই পাসপোর্টটির মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি নতুন করে ই-পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন।

তানয়ীম জামানের পাসপোর্ট হয় দুবাই থেকে

সাইফুজ্জামান জাবেদের পুত্র তানয়ীম জামান চৌধুরীর ই-পাসপোর্টও ইস্যু করা হয় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, দুবাই অফিস থেকে। তার ই-পাসপোর্ট নম্বর এ১৭৫৪৫৫** (শেষ দুটি সংখ্যা গোপন), জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৭৮১৫১০৯৩**। পাসপোর্টটি অর্ডিনারি ক্যাটাগরির, ৪৮ পৃষ্ঠার এবং এর মেয়াদ ২০৩৫ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত।

কনস্যুলেট সূত্র জানায়, তানয়ীম জামান চৌধুরীর পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট করা হয় ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি। এরপর অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে, ২৪ জানুয়ারি তার ই-পাসপোর্ট কনস্যুলেট থেকে সরবরাহ করা হয়।

তিনিও এর আগে ২০২০ সালের ৮ জুলাই একই দিনে তার বোনের সঙ্গে একটি এমআরপি পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছিলেন। ওই পাসপোর্টটির মেয়াদও ছিল ২০২৫ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত।

এক্সপ্রেস ডেলিভারি নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুজনেরই ই-পাসপোর্ট আবেদন করা হয় এক্সপ্রেস ডেলিভারি সুবিধায়। অতিরিক্ত ফি দিয়ে সাধারণ সময়ের তুলনায় দ্রুত যাচাই, অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ এবং স্বল্প সময়ে পাসপোর্ট সরবরাহ করা হয় এই ব্যবস্থায়। সাধারণত জরুরি ভ্রমণ, চিকিৎসা বা চাকরির প্রয়োজনে এই সেবা নেওয়া হয়।

তবে যাদের বিরুদ্ধে আদালতের আদেশে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিদেশে বসে এক্সপ্রেস ডেলিভারিতে ই-পাসপোর্ট ইস্যুর আগে প্রয়োজনীয় আইনগত যাচাই ও অনুমোদন হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও দুদকের অবস্থান

গত বছরের ২২ জুন ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর তিন সন্তানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে দেওয়া ওই আদেশ এখনো বহাল রয়েছে বলে দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান জানিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্তদের মধ্যে তানয়ীম জামান চৌধুরী ও জেবা জামান দুজনেরই ই-পাসপোর্ট দুবাই কনস্যুলেট থেকে সরবরাহ হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এতে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কনস্যুলেটের ভূমিকা

দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আগের সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত এক প্রটোকল কর্মকর্তা পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট থেকে ডেলিভারি প্রক্রিয়া সহজ করতে ভূমিকা রেখেছেন। এসব অভিযোগ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র জানায়, জেবা জামান ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর হারিয়ে যাওয়া পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর জন্য দুবাই কনস্যুলেটে আবেদন করেন। আবেদনপত্রে তিনি বর্তমান ঠিকানা হিসেবে চট্টগ্রামের একটি ঠিকানা উল্লেখ করেন এবং বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন করা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কনস্যুলেট থেকে মতামতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি পত্র পাঠানো হয়।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এ বিষয়ে দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামানের সঙ্গে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আট দেশে থাকা ৩৩০টি বাড়ি-ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ

গত ১৩ জানুয়ারি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আট দেশে থাকা ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে থাকা দুটি কোম্পানিতে করা বিনিয়োগও অবরুদ্ধ করা হয়। এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের মোট মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অন্য দেশগুলো হলো ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। দুদকের পৃথক আটটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন।

আদেশ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে সাইফুজ্জামানের ৪০টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মূল্য ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। সেখানে তার নামে থাকা জেডটিএস প্রোপার্টিজ ও তানয়ীম প্রোপার্টিজে বিনিয়োগ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তানয়ীম প্রোপার্টিজে বিনিয়োগ রয়েছে ১ কোটি ডলার বা প্রায় ১২২ কোটি টাকা।

কম্বোডিয়ায় থাকা ১১৭টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য ৩ কোটি ৫৪ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৭ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৩২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ভারতে থাকা ৯টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মূল্য ৭ কোটি ১৪ লাখ ২১ হাজার ৫৫৬ রুপি, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা ৫৯টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মূল্য ২১ কোটি ১৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৯৫ দিরহাম, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৯৮ কোটি ৯২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ভিয়েতনামে থাকা ৩০টি অ্যাপার্টমেন্ট ও ৩টি ফ্ল্যাটের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬৩ কোটি ৮৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা।

মালয়েশিয়ায় থাকা ৪৭টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মূল্য ১০ কোটি ৪৫ লাখ ১৫ হাজার ৫৩৩ রিঙ্গিত, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে থাকা ২৩টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মূল্য ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ ৭৯ হাজার ৫৬০ বাথ, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩৬ কোটি ২৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা। ফিলিপাইনের ম্যানিলায় থাকা দুটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৮৮ হাজার ৫৯০ পেসো, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ কোটি ৬৯ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।

দুদকের আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তদন্ত চলাকালে তার স্ত্রী রুকমিলা জামানের গাড়িচালক ইলিয়াস তালুকদারের বাড়ির প্রতিবেশী ওসমান তালুকদারের বাড়ি থেকে বিভিন্ন দলিলপত্র উদ্ধার হয়। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে এসব সম্পদ ফেরত আনা জরুরি হওয়ায় জব্দ ও অবরুদ্ধের নির্দেশ চাওয়া হয়।

চট্টগ্রাম প্রতিদিনি