Image description

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, তরুণ উন্নয়ন এবং আইসিটি খাতভিত্তিক বিস্তারিত নীতিগত রূপরেখা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘পলিসি সামিট-২০২৫’-এ ঘোষিত রূপরেখা ক্ষমতায় যাওয়ার পর বাস্তবায়নের কথা জানায় দলটি।

জামায়াতের রূপরেখা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৬ থেকে ৮ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক নাগরিক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে মোট ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ‘ফার্স্ট হান্ড্রেড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় প্রসূতি নারী ও মায়েদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবা একত্রে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে সকল শিশুর জন্য বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

শিল্প ও অর্থনীতি খাতে প্রণোদনা দিতে প্রথম তিন বছরের জন্য সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা হবে এবং এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের জন্য ১০ শতাংশ মালিকানা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

কৃষি খাতে কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ লাখ গ্রাজুয়েটকে দুই বছর মেয়াদে মাসিক ১০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মেধাভিত্তিক এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্যও মাসিক ১০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

উচ্চশিক্ষা প্রসারে প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত ঋণের মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নারী শিক্ষার প্রসারে ইডেন কলেজ ও বদরুন্নেসা কলেজ একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।

তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্ট’ নামে একটি নতুন মন্ত্রণালয় গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ১০ মিলিয়ন তরুণকে বাজারভিত্তিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ এবং প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে পাঁচ বছরে পাঁচ মিলিয়ন মানুষের চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে পাঁচ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি, ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার গড়ে তোলা এবং স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

আইসিটি খাতের জন্য ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি–ভিত্তিক চাকরি সৃষ্টি ও প্লেসমেন্ট নিশ্চিত করা হবে। ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির সুবিধার্থে একটি জাতীয় পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন করা হবে এবং আইসিটি খাত থেকে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইসিটি খাতে সরকারের ব্যয় থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয়ের কথাও জানানো হয়েছে।

সামিটে কি-নোট বক্তব্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও অসমাপ্ত সংগ্রামের ইতিহাস—রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও মানবিক মর্যাদার সংগ্রাম। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তি। তবে পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও সেই প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী চর্চার কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে, জবাবদিহি কমেছে এবং নাগরিকদের কণ্ঠস্বর সংকুচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আবারও জনগণ—বিশেষ করে তরুণরা—নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের দাবিতে দাঁড়িয়ে গেছে।

জামায়াত আমির বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের একটি অন্ধকার অধ্যায় পার করে আমরা এখন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এই পথে এখনও বড় বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

অর্থনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থানের মান কমে গেছে। বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক, অনিরাপদ ও স্বল্প আয়ের কাজে নিয়োজিত। তরুণ শিক্ষিতরা শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে রূপান্তর ঘটাতে পারছে না, আর নারীরা সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শুধু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পরিকল্পনার সক্ষমতা তৈরি করাই হওয়া উচিত অর্থনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি।

তিনি বলেন, বিপুল সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণ। দেশের ভেতরে শ্রমজীবী মানুষ এবং দেশের বাইরে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকরা অর্থনীতি সচল রাখছেন। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু অর্থনৈতিক অবদান নয়, বরং দক্ষতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার একটি বড় উৎস।

নারীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এটি শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রয়োজন।

সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে। অতীতে জামায়াতের নেতৃত্বে পরিচালিত মন্ত্রণালয়গুলোতে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ প্রশাসনের নজির রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে।

শেষে তিনি বলেন, ইনসাফ, মর্যাদা ও সমৃদ্ধির ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়াই আমাদের লক্ষ্য। জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।