ইকতেদার আহমেদ
নাগরিকত্ব অর্জনে বিশ্বের বেশির ভাগ রাষ্ট্রে দুই ধরনের নীতি অনুসৃত হয়। এর একটি- নিজ অথবা বাবা-মার জন্মস্থানের সূত্রে নাগরিকত্ব। অন্যটি এক স্থানে একাদিক্রমে কিছুকাল বসবাসের কারণে নাগরিকত্ব। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬ সংসদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতাবিষয়ক। অনুচ্ছেদটিতে মোট পাঁচটি দফা রয়েছে।
অনুচ্ছেদটির দফা (১) এ বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলে এবং তার বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে এ অনুচ্ছেদের দফা (২) এ বর্ণিত বিধান সাপেক্ষে তিনি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন।
দফা (২) এ বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ-সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি (ক) কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতস্থ বলে ঘোষণা করেন; (খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি লাভ না করে থাকেন; (গ) তিনি কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন; (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছরকাল অতিবাহিত না হয়ে থাকে; (ঙ) তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন কোনো অপরাধে দণ্ডিত হয়ে থাকেন; (চ) আইনের দ্বারা পদাধিধারীকে অযোগ্য ঘোষণা করছে না, এমন পদ ব্যতীত তিনি প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন; অথবা (ছ) তিনি কোনো আইনের দ্বারা বা অধীন অনুরূপ নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হন।
দফা (২ক) এ বলা হয়েছে- এ অনুচ্ছেদের দফা (২) উপ-দফা (গ) তে যা কিছু থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে এবং পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তি (ক) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশী রাষ্ট্্েরর নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে; কিংবা (খ) অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে- এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য হবেন না।
দফা (৩) এ বলা হয়েছে- এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোনো ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হওয়ার কারণে প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত হলে গণ্য হবেন না।
দফা (৪) এ বলা হয়েছে- কোনো সংসদ সদস্য তার নির্বাচনের পর এ অনুচ্ছেদের দফা (২) এ বর্ণিত অযোগ্যতার অধীন হয়েছেন কি না কিংবা এ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ অনুসারে কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
সর্বশেষ দফা (৫) এ বলা হয়েছে- এ অনুচ্ছেদের দফা (৪) এর বিধানাবলি যাতে পূর্ণ কার্যকারিতা লাভ করতে পারে, সে উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতাদানের জন্য সংসদ যেরূপ প্রয়োজন বোধ করবেন, আইনের দ্বারা সেরূপ বিধান করতে পারবেন।
বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। সংবিধান কার্যকর পরবর্তী দফা (২) উপদফা (গ) এ বর্ণিত অযোগ্যতা- তিনি কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন যেরূপ ছিল অদ্যাবধি অপরিবর্তিত রয়েছে; তবে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দফা (২ক) সন্নিবেশন করে বলা হয়- এ অনুচ্ছেদের দফা (২) উপ-দফা (গ)-তে যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে এবং পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি (ক) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশী রাষ্ট্্েরর নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে; কিংবা (খ) অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে- এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য হবেন না।
অনুচ্ছেদটির উপ-দফা (গ) অবলোকনে স্পষ্টত প্রতিভাত, একজন ব্যক্তি কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে তিনি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না।
দফা (২ক) অবলোকনে প্রতীয়মান হয় উপ-দফা (গ)-তে বর্ণিত অযোগ্যতাকে শিথিল করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়ে বলা হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে কিংবা পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে তিনি বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য হবেন না।
এখন প্রশ্ন, জাতীয় সংসদ বা সংসদ সদস্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে হলে দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে কখন তাকে বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে অথবা পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে হবে।
একজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদ বা সংসদ সদস্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে হলে তাকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিযুক্ত রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে হয় এবং বলতে হয়, তিনি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬-তে বর্ণিত যোগ্যতা অর্জন করেছেন এবং অযোগ্যতাগুলোর অধিকারী নন। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক মনোনয়নপত্রে উল্লিখিত যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাইপূর্বক সিদ্ধান্ত প্রদান করার বিধান থাকলেও দেখা যায়, একই বিষয়ে বিশেষত দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্ত প্রদানে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।
রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে যেমন আপিলের সুযোগ রয়েছে; অনুরূপ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও উচ্চাদালতের হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন পেশের সুযোগ রয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ দ্বারা সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন পেশ করতে পারেন।
দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ক সংবিধানে বর্ণিত যে অযোগ্যতা তা দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকাকালীন একক ও অভিন্ন। তাই দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রেখে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়া বা সংসদ সদস্য হিসেবে থাকা সম্পূর্ণরূপে বেআইনি ও অকার্যকর।
একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া পরবর্তী সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে তাকে সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত সংসদ সদস্যের জন্য নির্ধারিত শপথবাক্য পাঠ করতে হয় এবং শপথপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। এর অন্যথায় স্পিকার কর্তৃক শপথ গ্রহণের সময়সীমা বর্ধিত না করলে তার আসন শূন্য হয়।
শপথ গ্রহণের সময় একজন সংসদ সদস্যকে অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করতে হয়, তিনি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করেন। এ অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য অবশ্যই শতভাগ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এটিতে বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই।
একজন ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিক হলে স্বভাবত প্রশ্নের উদয় হয়, তার বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য কতভাগ এবং তিনি যে বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিক সে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য কতভাগ। যেহেতু আনুগত্যের বিষয়টি বিভাজনের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়, সেহেতু আনুগত্য অবশ্যই নিজ জন্মভূমি স্বদেশের প্রতি শতভাগ হতে হবে। এ কারণে সংবিধানে দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়া এবং সংসদ সদস্য হিসেবে থাকার অযোগ্য করা হয়েছে।
আমাদের নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫১-তে (দ্য সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট, ১৯৫১) দ্বৈত নাগরিকত্ব বারিত হলেও বাংলাদেশ নাগরিকত্ব (অস্থায়ী বিধান) আদেশ, ১৯৭২ ( দ্য বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ টেম্পোরারি প্রোভিশন্স) অর্ডার, ১৯৭২)- এর বিধান অনুযায়ী, ইউরোপ অথবা উত্তর আমেরিকা অথবা সরকার কর্তৃক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্ধারিত অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের নাগরিককে সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিতে পারে। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, বিদেশী নাগরিকত্ব বহাল রেখে সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে বা অপরাপর সাংবিধানিক পদধারী হতে ভাবাগতভাবে বিধিনিষেধ সাংবিধানিক পদধারীদের অনুরূপ হওয়া সত্তে¡ও অনেকে বিষয়টিকে উপেক্ষা করে দেশের সর্বোচ্চ আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনপূর্বক গোটা জাতির সাথে উপহাস করছেন।
বাংলাদেশ নাগরিকত্ব (অস্থায়ী বিধান) আদেশ, ১৯৭২-এ সংশোধনী আনয়নপূর্বক ১৯৭৮ সালে সামরিক শাসন বহাল থাকাবস্থায় অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধনী আনয়নপূর্বক ধারা ২(বি) সন্নিবেশিত করে দফা (২)এ বলা হয়- ওই আইনের ২ ধারায় এবং বর্তমানে বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছু থাকুক না কেন, ইউরোপ অথবা উত্তর আমেরিকা অথবা সরকার কর্তৃক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উল্লিখিত অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের নাগরিককে সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিতে পারে।