Image description

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) শীর্ষ পদের কয়েকজনসহ অন্তত অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে নজরদারি শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে দুদকের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম বেবিচকের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও নথি সংগ্রহ করেছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

হঠাৎ দুদকের এমন তৎপরতায় বেবিচকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন, তাদের জন্য এখন সময় কঠিন হয়ে আসছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দুদকের নজরদারির প্রভাবেই গত ৮ জানুয়ারি ৯ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। বদলি হওয়া অনেকেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। দুদক যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এতে বেবিচকের পক্ষ থেকে কোনও বাধা নেই; বরং আমরা সহযোগিতা করছি।”

তিনি আরও বলেন, “বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে বেবিচককে দুর্নীতিমুক্ত ও অপরাধমুক্ত রাখার চেষ্টা চলছে।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বেবিচকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নানা অপকর্মে জড়িত। তাদের মধ্যে অনেকেই মানবপাচারের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। একের পর এক তালিকা তৈরি হলেও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের সময়েও এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি; বরং তৎপরতা আরও বেড়েছে।

তবে এসব অপকর্মের ফিরিস্তি উদঘাটনে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দুর্নীতি দমন কমিশন। ইতোমধ্যে ৬৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য সংগ্রহ করে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ জানুয়ারি বেবিচকের সদর দফতরে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়। দুদক সূত্র জানায়, অভিযানে রিটেনশন মানি, সফট ওপেনিং, আমদানি করা মালামাল, প্রকৌশলীদের আবাসন এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথি বিশ্লেষণ করে কমিশনে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

সূত্র মতে, দুদকের নজরদারিতে থাকা অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকায় বেবিচকের শীর্ষ পর্যায়ের দু-একজন কর্মকর্তার নামও রয়েছেন।

বেবিচকের সদর দফতরে দুদকের অভিযানের পর নড়েচড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে গত ৮ জানুয়ারি ৯ জন এরোড্রাম ফায়ার অপারেটরকে বদলি করা হয়। তারা হলেন—শাহীনুর রহমান খান, মো. জামির হোসেন, বলরাম মজুমদার, মো. রকিব হাসান তালুকদার, মো. আলমগীর হোসেন, মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, মো. হারুন-অর-রশিদ প্রামাণিক, গাজী তোফায়েল আহমেদ ও মো. মিজানুর রহমান।

জানা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বিমানবন্দরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। চক্রের সদস্যরা স্বর্ণপাচারসহ নানা অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। মানবপাচার, মাদকপাচার ও নাশকতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বেবিচকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালানের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ চক্রের বাহক ও আশ্রয়দাতারা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে অবস্থান নিয়ে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছে। বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হলেও আইনের ফাঁকফোকর গলে অনেকেই আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এর আগে শাহজালালে কর্মরত অবস্থায় বেবিচকের সশস্ত্র নিরাপত্তা প্রহরী এ কে এম আমানুল্লাহ মিয়া এবং বোর্ডিং ব্রিজ অপারেটর হাফিজুর রহমান আকন্দ মানবপাচার ও স্বর্ণপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা প্রহরী রেজাউল করিম (সাময়িক বরখাস্ত), মো. আবু তালেব (সাময়িক বরখাস্ত), ইলিয়াস উদ্দিন, এরোড্রাম ফায়ার ফাইটার তাওহীদুল ইসলাম, মেকানিক জামাল উদ্দিন পাটোয়ারী, নিরাপত্তা প্রহরী মাহবুবুল আলম, এটিএস শাখার ট্রাফিক হ্যান্ড আকরাম হোসেন এবং সিনিয়র এরোড্রাম অফিসার হাসান জহিরসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের প্রোফাইল সংগ্রহ করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে। তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।”

এদিকে বেবিচক ও বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার অপরাধ ঠেকাতে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িতদের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।

বেবিচক কর্মকর্তারা বলছেন, দুদক ও বর্তমান প্রশাসনের এমন তৎপরতায় অনেকেই আতঙ্কে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে বহাল থেকে যারা নানা অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।