Image description

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের ‘নিষিদ্ধ নগরে’ র‍্যাব কর্মকর্তা মোতালেবকে গুলি করে হত্যার পর এক সোর্সসহ তিন র‍্যাব সদস্যকে ধরে দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। পরে পুলিশ গিয়ে জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনে। এ ঘটনায় আহত হয় আরও চার র‍্যাব সদস্য। রাতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‍্যাবের সমন্বয়ে গড়া যৌথবাহিনী ঘটনাস্থলে অভিযান চালাচ্ছে।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, র‍্যাব-৭ এর একটি দল সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূল আবাসিক এলাকায় অভিযান চালাতে ঢোকে। কিন্তু ঢোকার মুখেই র‍্যাব সদস্যদের গাড়ি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের আক্রমণের মুখে পড়ে। তাদের অনেকের হাতেই অস্ত্র ছিল। অনেকে আবার ইট-পাটকেল ও লাঠিসোটা নিয়েও র‍্যাবের গাড়ির দিকে হামলা চালায়। এর একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা র‍্যাব সদস্যদের ঘিরে ফেলে গুলি চালাতে থাকে। এতে র‍্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) আবদুল মোতালেব গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়ার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় আহত আরও চার র‍্যাব সদস্যকে চিকিৎসার জন্য সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয় বলে জানা গেছে।

এদিকে ঘটনার সময় র‍্যাবের তিন সদস্য ও এক সোর্সকে ধরে পাহাড়ে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. সিরাজুল ইসলাম পিপিএম সেবা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘র‍্যাবের সদস্যরা অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। আহত সদস্য ও সোর্স উদ্ধার করা হয়েছে, কিন্তু একজন র‍্যাব সদস্যের মৃত্যু হয়েছে।’

এএসপি মোঃ সিরাজুল ইসলাম আরও জানান, ‘ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছেছি। নিহত র‍্যাব সদস্যের নাম ডিএডি মোতালেব বলে জেনেছি।’

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, ‘হামলার খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেছি। অতিরিক্ত ফোর্স অভিযান চালাচ্ছে।’

‘নিষিদ্ধ নগরী’

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে গত চার দশক ধরে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এই দখলদারিত্ব ও প্লট বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে এক দুর্ধর্ষ সশস্ত্র বাহিনী। এলাকাটিকে বর্তমানে একটি ‘নিষিদ্ধ নগরী’তে পরিণত করা হয়েছে, যেখানে বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে বিশেষ পরিচয়পত্র। বহিরাগত তো বটেই, এমনকি পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকারও সেখানে নিয়ন্ত্রিত। একাধিকবার অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে।

এই অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে দুটি শক্তিশালী পক্ষ। ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’র নেতৃত্বে রয়েছেন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ইয়াসিন মিয়া এবং ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’ নিয়ন্ত্রণে রাখছেন কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক। বর্তমানে এই দুই সমিতিতে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার।

প্রশাসনের ওপর হামলার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে প্রশাসনের ওপর নারকীয় হামলা চালানো হয়। এতে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। সন্ত্রাসীরা ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকেও গুলি চালাতে হয়।

এর আগে ২০২২ সালেও একাধিকবার র‍্যাব ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে পাহাড় কাটার সরঞ্জাম জব্দ করা হলেও, তাদের প্রস্থানের পরপরই পুনরায় শুরু হয় প্রকৃতির বুক চিরে মাটি কাটার উৎসব। মূলত প্রবেশমুখে থাকা অতন্দ্র পাহারাদারদের মাধ্যমে সংকেত পেয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আগেভাগেই পাহাড়ের ওপর অবস্থান নেয় এবং অতর্কিত হামলা চালায়, যা উচ্ছেদ অভিযানকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।