আমন মৌসুমের চাল যখন বাজারে আসছে, ঠিক তখনই বেসরকারি পর্যায়ে আমদানির সুযোগ দিচ্ছে সরকার। এই আমদানিতে ব্যবসায়ীদের চাওয়া পূরণ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দেশের কৃষকরা। এতে আমনের দামের পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সদ্য শুরু হওয়া বোরো মৌসুমের আবাদেও।
খোদ সরকারি তথ্য ও বাজার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশে এখন সরকারি চালের মজুত সবোর্চ্চ। আর সদ্য শেষ হওয়া আমন মৌসুম থেকে চালের ভালো জোগান পাওয়া যাচ্ছে। আমনের উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ টন, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ১৫ লাখ টন বেশি। গত আউশ মৌসুমেও চালের উৎপাদন ভালো ছিল।
এরমধ্যে গত সপ্তাহে সরু চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। দাম বাড়ার এ কারণকে পুঁজি করে এখন চাল আমদানির পাঁয়তারা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাতে সরকারেরও সায় মিলেছে।
গত রোববার বেসরকারিভাবে ২ লাখ টন সেদ্ধ চাল আমদানির জন্য ২৩২টি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়ার পর তাদের অনুকূলে আমদানির অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সরকার পর্যাপ্ত সরবরাহের বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে যৌক্তিক কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং চাল আমদানির সুযোগ করে দিচ্ছে
ওই চিঠিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় দেশের চালের বাজারে ঊর্ধ্বগতির প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী- সরু চালের বাজারদর বৃদ্ধির প্রবণতা সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাঝারি ও মোটা চালের বাজারদর আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও সরু চালের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতার মতো মাঝারি ও মোটা চালের বাজারদরও বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হঠাৎ করে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা আমদানির সুযোগ খুঁজছেন। ভরা মৌসুমেও তারা চাল নিয়ে শুরু করেছেন নতুন চালবাজি। কিন্তু সরকার পর্যাপ্ত সরবরাহের বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে যৌক্তিক কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং চাল আমদানির সুযোগ করে দিচ্ছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের একটি পক্ষ খাদ্য উপদেষ্টাকে চাল আমদানির জন্য রাজি করাতে উঠেপড়ে লেগেছে বলেও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছ
বর্তমান অবস্থায় চাল আমদানি করলে বোরো মৌসুমের কৃষকের উৎপাদিত ধানের দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ, এ মুহূর্তে সরকারের কাছে রয়েছে বড় মজুত এবং আমন থেকে পাওয়া ভালো সরবরাগ
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, সরকারের হাতে পর্যাপ্ত চালের মজুত রয়েছে, উৎপাদনও ভালো। সামনে বোরো আসছে, যা দেশের চাল উৎপাদনে সবচেয়ে বড় মৌসুম। এমন ভরা মৌসুমে চাল আমদানির কোনো কারণ দেখছি না। হঠাৎ করে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার কোনো একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিচ্ছে।
তবে আমদানি অনুমতির ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) মো. মনিরুজ্জামান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আসলে কিছুদিন আগে বাজারে সরু চালের দাম বেড়েছে। আমাদের সরু চালের উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। সেটা আসতে দেরি আছে। যে কারণে সরু চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানি প্রয়োজন।
এমন ভরা মৌসুমে চাল আমদানির কোনো কারণ দেখছি না। হঠাৎ করে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার কোনো একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিচ্ছে—কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম
বাজারের তথ্য বলছে, গত এক-দেড় সপ্তাহে সরু চাল হিসেবে পরিচিত জিরাশাইল ও শম্পা কাটারির দাম বেড়েছে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাইকারিতে জিরাশাইলের দাম দেড় শতাংশ বাড়ার প্রেক্ষাপটে খুচরায় ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়েছে। শম্পা কাটারির দাম পাইকারিতে ১ দশমিক ১৯ শতাংশ বাড়ার প্রেক্ষাপটে খুচরায় বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
চালকল মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই দুটি জাতের ধানের উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। যে কারণে সরবরাহ কমে গেছে, দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে দাম বাড়ার কোনো প্রভাব মোটা বা মাঝারি মানের যত সরু চাল রয়েছে তার ওপর পড়েনি। বাজারে এখন আমন মৌসুমের চালের ব্যাপক সরবরাহ রয়েছে।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, ওই এলাকায় জিরাশাইল ও শম্পা কাটারির চালের দাম বেড়েছে। তারপরও সেটা মিলগেটে ২ টাকার বেশি না। এসব চাল ছাড়া অন্য কোনো জাতের চালের দাম বাড়েনি। বরং নতুন চালের দাম কমছে।
কয়েকজন মিল মালিক বলেন, এ অবস্থায় সরু চাল আমদানি হলেও আসন্ন বোরো মৌসুমের জন্য সেটা ক্ষতিকর হবে।
সরকারের কাছে এখন চালের রেকর্ড মজুত রয়েছে। গত ১৫ জানুয়ারির তথ্য বলছে, প্রায় ২১ লাখ টন খাদ্যশস্যের মজুত রয়েছে সরকারের কাছে। এর মধ্যে চালই রয়েছে ১৮ লাখ ৪২ হাজার টনের বেশি। যা চলতি অর্থবছরে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিতরণ করেও শেষ হবে না। পাশাপাশি সরকারিভাবেই এ বছর ৫ লাখ টনের বেশি চাল আমদানির প্রক্রিয়া চলমান। বেসরকারিভাবে এরই মধ্যে ৪ লাখ ৮৩ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে।
কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত আমন মৌসুমে ১ কোটি ৮০ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ১ কোটি ৬৫ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছিল।