২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাণঘাতী মারণাস্ত্রের ব্যবহার একটি আলোচিত-সমালোচিত বিষয়। সম্প্রতি একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, জুলাইয়ে পুলিশের মারণাস্ত্রের ব্যবহারে নিহতদের প্রতি ৬ জনের একজন শিশু। নিহত আন্দোলনকারীদের অধিকাংশের বুক ও মাথায় গুলি করা হয়েছে বলেও গবেষণায় উঠে আসে।
সেন্টার ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড জাস্টিস ও ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের রিসার্চ স্কলার মো. আবু বকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে আরও ছিলেন মো. সাইফুল ইসলাম, শেখ মোজাম্মেল হোসেন ও মো. খালেদ সাইফুল্লাহ।
গবেষণায় জুলাই বিপ্লবের এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করে দেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত ২৫৩টি মৃত্যুর প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তিতে এই গবেষণামূলক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, জুলাই বিপ্লবে নিহতদের মধ্যে শতকরা ৫৮ জনই ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ। অধিকাংশ নিহত বিক্ষোভকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাণঘাতী গুলিতে মারা যান, যার হার শতকরা ৭৮-এর বেশি। এ ছাড়া নিহতদের শতকরা ৭৭ জন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণের সময় শতকরা ৭৫ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হন।
শতকরা ৪৬ জনকে বুকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে এবং মাথায় গুলি খেয়ে প্রাণ হারান ২৯ জনের বেশি আন্দোলনকারী। এ ধরনের আঘাতের ধরন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে নির্ধারিত নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ইচ্ছাকৃতভাবেই পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
গবেষণায় আরও উঠে আসে, দুর্নীতি ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তাদের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগে পুলিশের ভূমিকা ক্রমে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, গুম এবং শিশুসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতি অমানবিক আচরণ অন্যতম।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সূচনা হয় সরকার চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর মাধ্যমে—গড়ে ওঠা এই আন্দোলন দ্রুতই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সমর্থন লাভ করে। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল সরকারি নিয়োগে সমান ও ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা।
সরকার এই বিক্ষোভকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং কঠোর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়। কারফিউ জারি করা হয়, ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে আন্দোলন দমন করা হয়। কারফিউ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের মতো ঘটনা জনমনে রোষানলের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে শত শত মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় এবং আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে খুব কাছ থেকে গুলি চালানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ, শিশুদের হতাহত হওয়া এবং বসতবাড়ির ভেতরে হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ২০২৫ সালের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের বিক্ষোভ চলাকালে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ, শিশু হতাহতের ঘটনা এবং আবাসিক এলাকায় হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ গবেষণায় ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত ১ হাজার ১০৩টি সংবাদ প্রতিবেদন শনাক্ত করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে ৪৫৯টিতে মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়, বাছাইয়ের পর ২৬১টি সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে চূড়ান্তভাবে মোট ২৫৩টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব চলাকালে পুলিশের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর বণ্টন তুলে ধরা হয়েছে। মোট ২৫৩টি মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করে বয়স, মৃত্যুর স্থান, মৃত্যুর কারণ, গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থান এবং ভৌগোলিক বিভাজন অনুযায়ী ধরন নির্ধারণ করা হয়েছে। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহতদের অধিকাংশই তরুণ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৯ বছর, যা মোট মৃত্যুর ৫৮.১ শতাংশ (১৪৭ জন), শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ৪২ জন নিহত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ১৬.৬ শতাংশ। মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণে রেখে গেছে, পুলিশের সরাসরি গুলিতেই প্রাণ হারিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। পুলিশের মারারাস্ত্র থেকে ছোড়া প্রাণঘাতী গুলিতেই বিক্ষোভকারীরা প্রাণ হারিয়েছেন বলে মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে।
রাজধানী ঢাকায় মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে, যা মোট মৃত্যুর ৩৬ শতাংশ। শতকরা হিসেবে চট্টগ্রামে ১৭ জন, বরিশালে ও রাজশাহীতে ১১ জন করে, খুলনায় ৯ জনের বেশি, রংপুরে ৬ জন এবং সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৩ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
গবেষণার ফলাফল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনগণের মধ্যে একটি জটিল ও সংকটপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। জুলাই বিপ্লবে বাহিনীর আচরণ জনমনে গভীর নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. এনায়েত উল্ল্যা পাটওয়ারী। তার মতে, পুলিশের আচরণ ছিল ন্যক্কারজনক; জনগণের করের টাকায় কেনা অস্ত্র জনগণের ওপর ব্যবহার করে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে, যা জনমনে স্থায়ী ঘৃণাবোধ সৃষ্টি করেছে। তিনি আরও বলেন, পোশাক পরিবর্তনসহ নানা সংস্কার উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করছে, যার প্রভাব আগামী জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
সেন্টার ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড জাস্টিস ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের রিসার্চ স্কলার মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, জুলাই ২৪ বিপ্লবে পুলিশের ভূমিকা আধুনিক পুলিশ ইতিহাসে অন্যতম ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত। তার মতে, শিশু ও তরুণদের মাথা ও বুকে গুলি করা পুলিশের পাশবিকতার পরিচয় দেয়। তিনি এসব ঘটনা রোধে দোষীদের বিচার, পুলিশ সংস্কার, বডি ক্যামেরা, আইটি ইন্টিগ্রেশন এবং উন্নত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন এবং বলেন, পুলিশ জনগণের—কোনো রাজনৈতিক দলের নয়।