সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান নিচ্ছে, যা অব্যাহত থাকলে আসন্ন নির্বাচন বিতর্কিত হয়ে উঠবে। এর দায় শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই নিতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
রোববার (১৯ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াসহ দলের শীর্ষ নেতারা।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে নির্বাচন ও সমসাময়িক রাজনীতি গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা না থাকলে আসন্ন নির্বাচন বিতর্কিত হবে এবং এর দায় অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপরই বর্তাবে। সরকার সর্বোত্তম নির্বাচন উপহার দেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে সেই পরিবেশ দৃশ্যমান নয়।
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের চাপ, নির্বাচন কমিশনের সামনে মব সৃষ্টি এবং আগাম প্রভাব বিস্তারের কারণে কমিশন ক্রমেই পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের, নির্বাচন কমিশনের নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব বা ঋণখেলাপি যে দলেরই হোক না কেন আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।
গণভোটের পক্ষে প্রচারণাকে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে কোনো দলীয় প্রতীক নেই, তবু নির্বাচন কমিশন তা বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বে-আইনিভাবে পোস্টার, ফেস্টুন, শোকসভা ও ত্রাণ বিতরণের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা চললেও কমিশন তা উপেক্ষা করছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সামনে চাপ সৃষ্টি করলে রায় পাওয়া যায় এমন বার্তা গেলে তা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর হবে।
বিএনপির আচরণকে দায়িত্বজ্ঞানহীন উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে নির্বাচনী পরিবেশ একতরফা করার চেষ্টা জনগণের মধ্যে গভীর প্রশ্ন তৈরি করছে। তরুণ সমাজ কোনো পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন মেনে নেবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, সংস্কারের পক্ষে গণভোট এবং নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা থেকে এনসিপি সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে নিরপেক্ষ অবস্থানই তাদের প্রধান দাবি।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, আগের বিতর্কিত নির্বাচনের মতো এবারও দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাহিদ ইসলাম এবং ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীকে শো-কজ করার ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে উল্লেখ করেন। তার দাবি, ছবিসহ প্রচারণার অভিযোগ আনা হলেও সেটি ছিল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা, যা আচরণবিধি লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে না।
এনসিপির অভিযোগ, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা প্রকাশ্যে প্রতীক, পোস্টার ও শীর্ষ নেতাদের ছবি ব্যবহার করে প্রচারণা চালালেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অথচ এনসিপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের যোগসাজশে শো-কজ দিয়ে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালানো হচ্ছে।
সজীব ভুঁইয়া বলেন, নীতিমালা ও আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হলে নির্বাচন কমিশন ও পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তিনি শো-কজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বিষয়টি দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।
এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, ইলেকশন কমিশনের আচরণে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হচ্ছে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আস্থা কমছে। গণভোট ও নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। এই পরিস্থিতি চললে দল ও জোট ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামবে। তবে লক্ষ্য আন্দোলন নয়, সুষ্ঠু নির্বাচন। কোনো পরিকল্পিত বা ইঞ্জিনিয়ারড নির্বাচন মানা হবে না। ২০০৮ মতো নির্বাচন নয়, ৯১’ র মতো গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই হতে হবে।