Image description

‘বলা হচ্ছে ওরা আমার স্ত্রী ও মেয়েকে ঋণের টাকার জামিনদার হওয়ার জন্য খুন করছে, কিন্তু খুন করেছে গহনার জন্য। কারণ তাদের (স্ত্রী-কন্যা) কাছে দুটি স্বর্ণের চেইন, কানের দুল ও দুটি মোবাইল ছিল। প্রাইভেট শিক্ষক মীম সব নিয়ে নিয়েছে। আর ঋণের বিষয় যদি আসে, তাহলে আমার স্ত্রী তো তার উপকার করছে। এজন্য তাকে খুন করতে হবে? হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। স্ত্রী-কন্যা চলে গেছে তাদের তো আর ফিরে পাবো না, তবে বিচারটা যেন পাই।’ কাঁদো কাঁদো গলায় এসব বলেন কেরানীগঞ্জে ‘মা ও মেয়ে’ খুন হওয়া রোকেয়া রহমানের স্বামী শাহিন। 

তিনি বলেন, ‘গত ২৫ ডিসেম্বর প্রচণ্ড শীত থাকায় আর বাইরে বের হয়নি। পরদিন ফোন দেই, ফোন ধরে না। গিয়ে দেখি ঘর তালাবদ্ধ। লোকেশন চেক করে দেখি, সর্বশেষ ছিল মীমের প্রাইভেট শিক্ষকের বাসায়। ওই বাসায় খোঁজ নিতে গেলে মীমের স্বামী আমাকে হুমকি-ধামকি দেয়। অথচ সে কিন্তু লাশগুলো প্যাকেট করেছে। ফোন দিয়ে তার বাসায় যেতে চাইলে পরের দিন শনিবার আমাকে যেতে বলে।’

‘ওইদিন গেলে হয়তো তারা আমাকেও মেরে ফেলতো’

ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন কালিন্দী ইউনিয়নে নিখোঁজের ২১ দিন পর মা ও মেয়ের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দুই বোনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। খুনের রহস্য উদঘাটন করে পুলিশ বলেছে, ‘মেয়ে ফাতেমার প্রাইভেট শিক্ষক মীমের নেওয়া ঋণের টাকার জামিনদার হন রোকেয়া রহমান। এজন্য কিস্তি বকেয়া পড়ায় এনজিও থেকে তার ওপর চাপ আসে। বিষয়টি নিয়ে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। যার জন্য প্রাণ গেলো মা রোকেয়া রহমান ও মেয়ে জোবাইদা রহমান ফাতেমার। কেরানীগঞ্জের মুক্তিরবাগ এলাকায় ফাতেমা মীমের কাছে প্রাইভেট পড়তো। ঘটনার সময় মীমের বাসায় ছিল তার ছোট বোন নুরজাহানও।’ 

গত বৃহস্পতিবার রাতে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তিরবাগ এলাকার শিক্ষিকা মীম বেগমের ঘরের খাটের নিচ থেকে রোকেয়া রহমান ও ওই ফ্ল্যাটের বাথরুমের ফলস ছাদ থেকে ফাতেমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এ ঘটনায় গ্রেফতারের পর দুই আসামি মীম ও নুরজাহানকে শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কেরানীগঞ্জ থানার এসআই রনি চৌধুরী। দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন তিনি। পরে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ নুরজাহান কিশোরী হওয়ায় অর্থাৎ বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় তার জবানবন্দি রেকর্ড করেননি। তবে মীমের জবানবন্দি রেকর্ড করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এএসআই আলমগীর হোসেন। 

তিনি জানান, ‘নুরজাহানকে গাজীপুরে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তার বিষয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে শুনানি হবে।’

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভুক্তভোগীর পরিবারের তথ্য অনুযায়ী এ হত্যাটি ঋণের জামিনদার হওয়া এবং ঋণ পরিশোধ না করার কারণে সম্পর্ক খারাপ হওয়া থেকে হয়েছে। এটা সম্পর্কে আমাদের তদন্ত চলছে। এছাড়াও আদালত এ হত্যার ঘটনায় প্রাইভেট শিক্ষক মীমের জবানবন্দি নিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন।’ 

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, গৃহশিক্ষিকা মীম এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন, যার জামিনদার ছিলেন নিহত রোকেয়া বেগম। যার কিস্তি হিসেবে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে দিতে হতো। ঋণের কিস্তি বকেয়া পড়ায় তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়। গত ২৫ ডিসেম্বর রোকেয়ার মেয়ে ফাতেমা মীমের কাছে পড়তে গেলে টাকার প্রসঙ্গ তোলে। বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে তর্ক হয়। একপর্যায়ে ফাতেমা মীমকে থাপ্পড় দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মীম ও নুরজাহান ফাতেমাকে গলে টিপে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। 

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ফাতেমা অসুস্থ হয়ে পড়েছে জানিয়ে রোকেয়া বেগমকে বাসায় ডেকে আনেন মীম। বাসার ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নুরজাহান ওড়না পেঁচিয়ে রোকেয়া বেগমকেও শ্বাসরোধে হত্যা করে। ফাতেমার মরদেহ বাথরুমের ফলস ছাদে এবং মায়ের মরদেহ খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে।’

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এম সাইফুল আলম বলেন, ‘মূলত এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন গৃহ শিক্ষিকা মিম। আর সেই টাকার জামিনদার ছিলেন রোকেয়া বেগম। রোকেয়া বেগমের মেয়ে মিমের কাছে পড়ার সুবাদে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকায় রোকেয়া এনজিওয়ের টাকার জামিনদার হয়েছিল। সম্প্রতি বেশ কিছু ঋণের কিস্তি বকেয়া পড়ায় মিমের সঙ্গে রোকেয়ার সম্পর্কের অবনতি হয়। ২৫ ডিসেম্বর রোকেয়ার মেয়ে ফাতেমা পড়তে এসে মা টাকার কথা বলেছে— এমন কথা বলতেই রেগে গিয়ে মিম ও তার মেঝ বোন নুরজাহান ফাতেমার গলার ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। কিছুক্ষণ পর মেয়ে বাসায় ফিরছে না দেখে রোকেয়া বেগম মীমের বাড়িতে গিয়ে দেখে মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় সে চিৎকার করার চেষ্টা করলে মিমের মেঝ বোন নুরজাহান তাকেও পেছন থেকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ধরে। পরবর্তী সময়ে নুরজাহান ও মিম দুজনে মিলে শ্বাসরোধ রোকেয়া বেগমকে হত্যা করে মরদেহ খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে এবং আগে হত্যা করা ফাতেমার মরদেহ টয়লেটের ফলস ছাদে পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে রাখে। এরপর মেজো বোন নুরজাহান বেগম ফাতেমার পরনে থাকা জামা কাপড় খুলে সেগুলো পড়ে ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে যায়। এতে করে সিসি ক্যামেরায় দেখা যায় ফাতেমা পড়া শেষে বাসায় ফিরে যাচ্ছে। আসলে এটা ছিল মেজ বোন নুরজাহান। এই নুরজাহান ফাতেমার সঙ্গে একই শ্রেণিতে পড়াশুনা করতো। এর ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরে সিসি ক্যামেরায় এক নারীকে বোরকা পরিহিত অবস্থায় গৃহ শিক্ষিকা মীমের বাসায় প্রবেশ করতে দেখা যায়। তবে এটা ছিল নুরজাহান যে ১৫ মিনিট আগে ফাতেমার জামাকাপড় পড়ে বাইরে গিয়েছিল। বোরকা পরে আসার কারণে যাতে পুলিশ কিংবা অন্য কেউ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে কিছু বুঝতে না পারে। এ সময় পুরো ঘটনাটা মীমের ছোট বোন মাহি সবকিছু দেখছিল। তবে গৃহশিক্ষিকা মাহির স্বামী হুমায়ূন বাইরে ছিলেন।’

ওসি আরও বলেন, ‘মা-মেয়ে ২৫ তারিখ নিখোঁজ হলেও ২৭ তারিখ নিহত রোকেয়া রহমানের স্বামী হুমায়ুন মিয়া থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন। ডাইরির সূত্র ধরে সন্দেহভাজন গৃহ শিক্ষিকার বাসায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখা ও গৃহ শিক্ষিকাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে সময় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হুমায়ুন মিয়া নিশ্চিত করেন তার মেয়ে ফাতেমা গৃহশিক্ষিকার বাসা থেকে পড়া শেষে বেড়িয়ে গেছে। কারণ সিসি ক্যামেরায় তার মেয়ের পরনের জামা কাপড় পরিহিত একটি মেয়েকে বের হতে দেখা যায়। এটা দেখে হুয়ায়ূন পুলিশকে নিশ্চিত করেন। এ কারণেই তদন্ত ভিন্নখাতে চলে গিয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক চারজনের মধ্যে মিম ও তার বোন নুরজাহানকে আদালতে পাঠানো করা হয়েছে। তারা দুজনে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে রাজি হয়েছে।’

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েকদিন ধরে মুক্তিরবাগ এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ কোনও তল্লাশি চালায়নি। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার রাতে এলাকাবাসী নিজেরাই দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে শিক্ষিকা মীমের ফ্ল্যাটে পৌঁছায়। দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানালে তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে বাধ্য করে ঘটনাস্থলে আসতে। পুলিশ এসে তল্লাশি চালিয়ে মীমের ঘরের খাটের নিচ থেকে রোকেয়ার অর্ধগলিত মরদেহ এবং বাথরুমের ফলস ছাদ থেকে ফাতেমার মরদেহ উদ্ধার করে। 

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার রাতে কেরানীগঞ্জের কালিন্দি মুক্তিরবাগ এলাকায় অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জোবাইদা রহমান ওরফে ফাতেমা (১৪) এবং তার মা রোকেয়া রহমানের (৩২) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে মডেল থানা পুলিশ। পরে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম (২২), তার স্বামী হুমায়ুন মিয়া (২৮), মেজো বোন নুরজাহান বেগম (১৪) ও ছোটোবোন মাহিকে (১১) আটক করে পুলিশ।

গত ২৫ ডিসেম্বর বিকাল ৫টার দিকে ফাতেমা কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তিরবাগ এলাকায় মীমের বাসায় পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হন। সন্ধ্যায় নিখোঁজ হন রোকেয়া রহমানও। স্ত্রী-কন্যার খোঁজ না পেয়ে প্রথমে কেরানীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন শাহিন। তারপরও তাদের সন্ধান না পেয়ে গত ৬ জানুয়ারি মামলা করেন।