Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়া শেষ, যাচাই-বাছাইও শেষ, বৈধ-অবৈধ আপিলের পরে এখন মাঠে প্রচারণার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলগুলো। আগামী ২২ তারিখ থেকে তারা ভোটারদের কাছে যাবেন নানা আশ্বাস আর পরিকল্পনা হাতে নিয়ে।

নির্বাচন এলেই ইশতেহার দেয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট। কে কী করতে চান, তার একটা রূপরেখা হাজির করেন জনগণের সামনে। কিন্তু ইশতেহারে যা যা লেখা হয়, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, সেটির জবাবদিহি নিশ্চিত হয় কি? যারা নির্বাচনের আগে ইশতেহারে তাদের এজেন্ডা ঢোকানোর কথা বলেন, তারাও পরবর্তী সময়ে কতটা মনিটর করেন?

জনকল্যাণমুখী ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার প্রস্তুত করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, কর্মসংস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টা ইতোমধ্যে নেতাকর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন। এদিকে, নির্বাচনে দলীয় ইশতেহার তৈরিতে অনলাইনে জনমত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইশতেহারে দলটি শিক্ষা, নারীর কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

অন‍্যদিকে, দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের যার যার এজেন্ডাগুলো যেন ঠিকমতো ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তা নিয়ে গত একমাস সভা-সেমিনার করেছে এবং বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের কাছ থেকে সেসব এজেন্ডা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়েছে। বেসরকারি সংস্থার এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, ইশতেহার কেবল নির্বাচনের প্রতিশ্রুতির কাগজ নয়, ভোটের পরেও এটির ভূমিকা থাকার কথা। ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দেওয়া হয়, সেগুলোই পরে সরকারের কাজের মাপকাঠি হয়। কিন্তু এসব বাস্তবায়ন না করলে কী হবে, তা নিয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা না থাকায় এটা জবাবদিহিতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। অথচ, এটি নাগরিকদের সরকারকে প্রশ্ন করতে পারার হাতিয়ার হওয়ার কথা ছিল। পরের নির্বাচনে ভোটাররা আগের ইশতেহারের সঙ্গে বাস্তব কাজ তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাস্তবতা তৈরি হতে পারতো। অথচ, সেটি যা আমরা সাধারণত দেখি না।

“কথা দিলে তা রাখতে হয়” এমনটাই মানবিক নীতি উল্লেখ করে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি লিড অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ বলেন, “ইশতেহার নাগরিকদের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়ার কথা, যা তারা পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়ন করবেন। নাগরিকেরাও বিশ্বাস করতে চায় যে, তাদের দেওয়া কথা রাজনৈতিক দলগুলো রাখবে।”

ইশতেহারে পানি ও পরিচ্ছন্নতার ইস্যুটি অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিভিন্ন দলের নেতাদের অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছেন তিনি। এই প্রসঙ্গ টেনে ফাইয়াজউদ্দিন বলেন, “নিরাপদ পানি বাংলাদেশে আজ মৌলিক অধিকার। একইসঙ্গে নিরাপদ স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধিও জরুরি। বিশেষ করে নারীদের জন্য মাসিক স্বাস্থ্যবিধি। এসব বিষয় নিয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষে নয়শ’র অধিক সংগঠনের নয়টি মোর্চা রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে হাজির হয়ে তাদের বক্তব্য এবং সে অনুযায়ী কাজ—উভয়ই দাবি করেছে। পরস্পরের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, নির্বাচনের পরে উভয়পক্ষই একে অপরের কাছে নিয়মিত জবাব চাইবে—এই কথাগুলো বাস্তবে পরিণত হচ্ছে কিনা। সত্যিকারের গণতন্ত্র ও সুশাসন কেবল তখনই কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তব সত্য হয়ে উঠবে।”

ইশতেহারের আগের ও পরের তৎপরতার সমালোচনা করে এবারের নির্বাচনের প্রার্থী ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “নির্বাচনের আগে ইশতেহারের অংশ হতে নানা আলোচনা, সভা-সেমিনার হয়— অনেকটা বাজেটের মাসব্যাপী আলোচনার মতো। তখন আমরা দেখি, সারা মাস ধরে বাজেটের কোথায় কার প্রয়োজন, সেগুলো চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাজেট পাস হওয়ার পরে কী হয়, তা কেউ জানে না। অথচ চাইলে আলোচনার আগের ও পরের পরিস্থিতি মিলিয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। সে জন্য যদি একটি প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটিও ভাবা যেতে পারে। তবে ইশতেহার অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না— তা সবসময় তুলে ধরা জরুরি।”

উই ক্যানের সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেন, ইশতেহারে জবাবদিহিতা তৈরির কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। এর কারণ হিসেবে তার ভাষ্য, যিনি ইশতেহার দেন, তিনি যদি প্রতিশ্রুতি পূরণ না করেন, তার ফল কী হবে—সে আলোচনা কোথাও নেই। আর এই আলোচনা না থাকার সুযোগেই ইচ্ছেমতো প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা তাদের নিজ নিজ এজেন্ডার কথা তুলে ধরলেও সেগুলো কেউ শোনে বলে মনে হয় না।

তিনি বলেন, মূল সমস্যা হলো—ইশতেহারের সঙ্গে সরকার গঠনের পরের কোনও সংযোগ থাকে না। প্রার্থী জনপ্রতিনিধি হওয়ার উদ্দেশ্যে মাঠে গিয়ে ভোটারের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর সেই ভোটে তিনি নীতিনির্ধারক হন। কিন্তু জনপ্রতিনিধি থেকে নীতিনির্ধারক হওয়ার এই যাত্রাপথে তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন, তার বিপরীতে জবাবদিহিতা বলতে পাঁচ বছর পর তাকে ভোট না দেওয়া—এই একটাই ব্যবস্থা থাকে। সেটির পরিবর্তে যদি মধ্যবর্তী সময়ে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়, তাহলে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

নির্বাচনের আগে যারা অঙ্গীকার করেন এবং যাদের প্রতি অঙ্গীকার করা হয়— উভয় পক্ষের মধ্যেই এক ধরনের উদাসীনতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবীর। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যারা অঙ্গীকার করেন, তারা নির্বাচনের পর এসব বিষয় আর মনে রাখেন না। আবার জনগণও জবাবদিহিতা চায় না। জনগণ যেহেতু চায় না, সে কারণে অনেকেই ইশতেহার দিতেও আগ্রহী হন না। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পরবর্তী সময়ে পালন না করার প্রবণতা বেশি।”

তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে জবাবদিহিতা আদায়ের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তোলার কাজটি করতে হবে। সংসদ কীভাবে কার্যকর হয়, দলগুলোকে কেন জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে—এসব বিষয়ে যারা লেখেন, বলেন এবং গণমাধ্যম—সবারই ধারাবাহিকভাবে কাজ করার দায়িত্ব রয়েছে। কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, দলগুলো বাস্তবে কাজ করছে কি না—তার ধারাবাহিক মূল্যায়ন হওয়া জরুরি।”

ইশতেহার চর্চা করতে হবে—এই ভাবনা থেকে নয়, বরং বড়সড় অঙ্গীকার দিয়ে দেওয়ার একটি রেওয়াজ এতদিন ধরে দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা এতদিন দেখেছি, ইশতেহার দিতে হবে বলেই অনেক ক্ষেত্রে দায়সারা ভাবে তা দেওয়া হতো। সেগুলো যদি বাস্তবায়িত হতো, তাহলে জুলাই আসতো না। তবে জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় আমরা সঠিক অঙ্গীকার আশা করতে পারি।”

তিনি বলেন, “ইশতেহার কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হলে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে না। সে ক্ষেত্রে এত ত্যাগের বিপরীতে যে প্রাপ্তি, তারও অবমূল্যায়ন হবে।”

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, “এই আন্দোলন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে—এটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কারের মূল জায়গাগুলোর প্রতিফলন থাকবে বলেও আমরা আশা করছি।”