Image description

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বৈষম্য হ্রাস, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আগামী সরকারের জন্য জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ ব্যয়ে ১০ দফা জাতীয় কর্মসূচির রূপরেখা তুলে ধরেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংকট, অস্থির শ্রমবাজার, কৃষি ও নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সুশাসনের ঘাটতির মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এসব প্রস্তাব একটি সমন্বিত কল্যাণরাষ্ট্রভিত্তিক নীতিকাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ : আগামী সরকারের জন্য নাগরিক সুপারিশ’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে নাগরিক ইশতেহার ২০২৬-এর পাশাপাশি এই জাতীয় কর্মসূচিগুলো তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

জাতীয় কর্মসূচির বিস্তারিত উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য সুলতানা কামাল, রাশেদা কে. চৌধূরী, শাহীন আনাম, আসিফ ইব্রাহিমসহ বিশিষ্ট নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও অর্থনীতিবিদরা।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কেবল নীতিকথা, কাঠামো বা মূল্যবোধের কথা বললেই দেশের উন্নয়ন সংকটের সমাধান হবে না। অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা বা নীতিগত ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও কার্যকর কাঠামো না থাকায় সেগুলো বাস্তবে রূপ নেয়নি।

এ কারণেই নাগরিক প্ল্যাটফর্ম খাতভিত্তিক নীতির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে, যা সরাসরি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বক্তব্য দিতে  গিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, দেশের গণতন্ত্র, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তথাকথিত নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়নে গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে এখন স্পষ্টভাবে প্রশ্ন উঠছেবর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আদৌ নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে কি না।

তাঁর মতে, নতুন বন্দোবস্তের নামে মূলত উপরিকাঠামোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে; কিন্তু সমাজের অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত না করলে সংবিধান সংশোধন বা শাসনতান্ত্রিক ভারসাম্যের মতো পরিবর্তন টেকসই হয় না।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন বন্দোবস্তের দাবিদাররাই শেষ পর্যন্ত পুরনো বন্দোবস্তের অংশ হয়ে পড়েছে এবং ব্যয়বহুল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। এতে পুরনো কায়েমি স্বার্থ আবার শক্ত অবস্থান ফিরে পেয়েছে। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যবসায়ীরা পালিয়ে গেলেন, রাজনীতিবিদরা আত্মগোপনে গেলেন, কিন্তু আমলাতন্ত্র ফিরে এসেছে, কারণ পুরনো বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় রক্ষক এই আমলাতন্ত্র।

তাঁর অভিযোগ, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারই এই আমলাতন্ত্রের পুনরুত্থানের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে, যার ফলে সরকার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

গণমাধ্যম প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অতীতে গঠিত মিডিয়া কমিশনের কোনো সুপারিশেরই বাস্তবায়িত হয়নি।

বিশেষ করে মিডিয়া হাউসগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে গণমাধ্যমের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে সাংবাদিকদের পেশাজীবী সংগঠনগুলোও স্বাধীন ভূমিকা রাখতে পারছে না।

জাতীয় কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বৈষম্য ও দারিদ্র্য হ্রাসে সবচেয়ে বড় প্রস্তাব হলো সর্বজনীন ন্যূনতম আয় বা গ্যারান্টিযুক্ত আয় কর্মসূচি। চার সদস্যের একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদার ২৫ শতাংশ আয় হিসাবে মাসে চার হাজার ৫৪০ টাকা করে নগদ সহায়তার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি লক্ষ্যভিত্তিকভাবে বাস্তবায়িত হবে। প্রথম ধাপে অতি দারিদ্র্যপীড়িত ১১ জেলার ২৮ লাখ মানুষ, পরবর্তী ধাপে ৩৬ জেলার ৮০ লাখ মানুষ এবং শেষ পর্যস্ত সারা দেশে মোট এক কোটি ৪৭ লাখ পরিবার এই সহায়তার আওতায় আসবে। প্রথম ধাপে ৩৬ জেলায় বাস্তবায়নে বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে থাকা প্রায় ১৪০টি কর্মসূচির ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করে জোগান দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য কমাতে সরকারি বিদ্যালয়ে মিডডে মিল চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের প্রায় এক কোটি ১৮ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এক বেলা পুষ্টিকর খাবার পাবে। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের মতে, এতে ঝরে পড়া, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। প্রাথমিকভাবে এ কর্মসূচিতে ব্যয় হতে পারে প্রায় আট হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকবে।

স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবার বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা, ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষার সুবিধা পাবে। প্রথম ধাপে ৬১ লাখ বয়স্ক ভাতাভোগীর পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ হাজার কোটি টাকা।

যুবসমাজকে অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় করতে পস্তাব করা হয়েছে যুব ক্রেডিট কার্ডের। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা কর্মসংস্থানে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত সুদ ও জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিবছর এক লাখ তরুণ-তরুণী এই সুবিধা পাবেন বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কৃষি খাতে স্মার্ট কৃষি কার্ড বাংলাদেশ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় এক কোটি ৬৫ লাখ কৃষি পরিবার চাহিদাভিত্তিক কৃষি প্রণোদনা ও ডিজিটাল সম্প্রসারণ সেবা পাবে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে ও বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে প্রায় সাত কোটি ১৭ লাখ শ্রমশক্তিকে লক্ষ্য করে একটি জাতীয় শ্রমবাজার তথ্যবিনিময় প্ল্যাটফর্ম চালুর পস্তাব দেওয়া হয়েছে।

নগরজীবনের ভোগান্তি কমাতে সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে, যেখানে চালক ও সহকারীরা হবেন বেতনভুক্ত কর্মচারী। রাজস্বব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে সমন্বিত করব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন দাখিল, ই-পেমেন্ট ও দ্রুত কর ফেরতের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নাগরিক সেবার ভিত্তি হিসেবে একটি জাতীয় সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের মতে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং চলমান প্রকল্পগুলোর যৌক্তিক পরিমার্জন নিশ্চিত করা গেলে এই ১০ দফা জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নযোগ্য ও কার্যকর হবে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।