দফায় দফায় বৈঠকের পর অবশেষে ২৫৩টি আসনে সমঝোতায় পৌঁছেছে জামায়াতসহ ১১ দল। তবে, আরও ৪৭টি আসন এখনও কোনও দলকে দেওয়া হয়নি। অবশ্য এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেয়নি অন্যতম শরিক চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এ বিষয়ে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান জানাবে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসলামী আন্দোলনের এক শীর্ষ নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, তারা চূড়ান্তভাবে জামায়াতের ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ জোটে থাকছেন না।
ওই নেতা বলেন, “আমরা যেই উদ্দেশে এক হয়েছিলাম, বাকি ১০ দল সে কথা রাখেনি। বিশেষ করে ওয়ান বক্স ভোটের নীতি ইসলামী আন্দোলনের প্রস্তাব হলেও একটি বিশেষ দল একক কর্তৃত্ব দেখাচ্ছে। তাই আমরা আমাদের মতো চলতে চাই। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আরও বিস্তারিত জানানো হবে।”
জামায়াতের সঙ্গে কেন থাকতে চান না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইসলামী আন্দোলনের এক শীর্ষ নেতা জানান, তারা এনসিপিকে এতো আসন দেওয়ায় কিছুটা ক্ষুব্ধ। কারণ, শুরুতে ইসলামী জোটের কথা বলা হলেও সেখানে অযাচিতভাবে অনেক দলকে ডেকে আনা হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা না থাকা নিয়ে বৃহস্পতিবার দিনভর নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানা সংবাদ পরিবেশন হয়। এরই মধ্যে দুপুরে মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলের জরুরি বৈঠক হয়। এতে যোগ দেয়নি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
বৈঠক শেষে জামায়াতের নেতারা জানিয়েছিলেন, রাতের সংবাদ সম্মেলনে দলটির প্রতিনিধি থাকতে পারেন। কিন্তু, তারা না আসায় সে গুঞ্জন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তাই সবার চোখ দলটির শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনের দিকে।
যদিও সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে এখনও সমাধানের পথ দেখছেন জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলোর নেতারা। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এখনও আশাবাদী। প্রয়োজনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “আলোচনা এখনও চলমান।” ইসলামী আন্দোলন ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
দফায় দফায় বৈঠকেও কাটেনি সংকট
মূলত ১৪ জানুয়ারিতেই আসন সমঝোতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চেয়েছিলো ১১ দল। সে অনুযায়ী সেদিন বিকালে রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু, শেষ মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে জানানো হয় তারা নানা কারণে এতে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না।
এর কিছুক্ষণ পরই দলগুলোর ঐক্য প্রক্রিয়ার সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের কথা জানানো হয়। ওই দিন রাতেই নিজেদের মজলিসে দীর্ঘ বৈঠক করেছে ইসলামি আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা। কিন্তু, কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
বিরোধ কী নিয়ে?
পিআর, গণভোট ও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গত কয়েক মাস ধরেই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করে আসছে জামায়াতসহ আটটি রাজনৈতিক দল৷ এসব দলের মধ্যে শুরুতেই ছিলো, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলামী পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)।
এরই মধ্যে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময়ের একদিন আগে গত ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে আরও তিনটি দল যুক্ত হওয়ার কথা জানান জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। এই তিন দলের মধ্যে রয়েছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি) পার্টি।
এই তিন দল যোগদানের পর পরপরই এনসিপির শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে ফেসবুকে শুভেচ্ছা জানিয়ে নির্বাচনি মাঠ থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন জামায়াত মনোনীত বেশ কয়েকজন প্রার্থী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে শুভ কামনা জানিয়ে সরে যান জামায়াতের আতিকুর রহমান।
একইভাবে ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে সমর্থন দিয়ে স্ট্যাটাস দেন জামায়াতের ড. হেলাল উদ্দিন। সারা দেশে অর্ধ ডজনেরও বেশি আসনে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু, ইসলামী আন্দোলনের আসনের বেলায় এমনটি করেনি জামায়াত। বরং তাদের শীর্ষ নেতাদের আসনেও প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। একইভাবে জামায়াতের আসনেও প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
তখন খবর বের হয় এনসিপিকে ৩০ আসন ছাড় দেওয়া হচ্ছে। জোটের কয়েক জননেতা জানান, এ বিষয়টিকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি ইসলামী আন্দোলন। তাছাড়াও তারা শুরুতেই শতাধিক আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত ৮০টিতে অনড় ছিলো। কিন্তু, জামায়াতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা ৪০-৪৫টির বেশি আসন ছাড়বে না। এরপর থেকেই দূরত্ব সৃষ্টি।
অবশেষ দলভিত্তিক আসন বণ্টন
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণের জন্য ২৫৩টি আসন বণ্টন চূড়ান্ত করে জামায়াতসহ ১১ দল। বাকি ৪৭টিতে পরবর্তীতে তালিকা ঘোষণা করার কথা জানানো। এগুলো রাখা হয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাগপা ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের জন্য।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ১১ দলের সংবাদ সম্মেলনে শরিকদের আসনের তালিকা ঘোষণা করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের।
জামায়াত ১৭৯, এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০, খেলাফত মজলিস ১০, এলডিপি ৭, এবি পার্টি ৩, বিডিপি ও নেজামে ইসলামী পার্টি যথাক্রমে পেয়েছে দু’টি করে আসন।
প্রাথমিক তালিকায় নেই জাগপা ও খেলাফত আন্দোলন
জোটে থাকলেও আসন বণ্টনের প্রাথমিক তালিকায় নেই খেলাফত আন্দোলন ও জাগপা। অবশ্য দুপুরে ১০ দলের বৈঠক শেষে জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তিনি বৃহত্তর স্বার্থে জোটের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। নির্বাচনে তিনি জোটভুক্ত দলগুলোর পক্ষে মাঠে থাকবেন।
রাশেদ প্রধানের পঞ্চগড়-১ (সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিলো। তবে, সেখানে মাঠে রয়েছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। অপরদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন আদৌ আসন ছাড় পায় কি না, সেটি কেউ নিশ্চিত করতে পারছেন না।
কীভাবে দেখছে জামায়াত?
ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ প্ল্যাটফর্মে ইসলামী আন্দোলন না থাকার গুঞ্জন যেন সঠিক না হয়, সে প্রত্যাশায় রয়েছে জামায়াত। এ বিষয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মতবিরোধ সত্ত্বেও আমরা এতগুলো দল এক হতে পেরেছি। এটা অবশ্য আনন্দের বিষয়। আশা করি, বাকি সমস্যাগুলো সমাধান হয়ে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪০ থেকে ৪৫টি আসন রাখা হয়েছে। তারা এখনও আমাদের মধ্যে নেই বলা যাবে না। সংবাদ সম্মেলনে কী ব্যাখ্যা দেয় সেটির অপেক্ষা করতে হবে।”
