গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ব্যাংক, মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্ডেন থেকে এসব কর্মকর্তা নিয়োগের প্যানেল প্রস্তুত করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, দলীয় পরিচিতি পাওয়া ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগের জন্য এ তালিকায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রয়েছেন। যদিও ইসলামী ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ না দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি। ইসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে সূত্র জানয়, বিগত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের এবার আর নিয়োগ দেওয়া হবে না। অবশ্য নির্বাচন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, সারা দেশে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ এ নির্বাচনে যে সংখ্যক ভোটগ্রহণ নিয়োগের প্রয়োজন হবে, তার চেয়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত কর্মকর্তার নাম রাখা হয়েছে। কর্মকর্তাদের নাম যখন চূড়ান্ত করা হবে তখন সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর পরও কোথাও সংকট দেখা দিলে খসড়া তালিকাভুক্ত বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, বিএনপির দাবির পর বেসরকারি ব্যাংক থেকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে না বলে ইসি সিদ্ধান্ত নেয়। এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়ে নির্বাচন কমিশন পরিপত্র-৩ জারি করে। কিন্তু পরবর্তীতে ওই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পরিপত্র-৬ জারি করা হয়। ওই পরিপত্রে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে পর্যাপ্ত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা পাওয়া না গেলে কেবল তখনই বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর পরই তাদের নিয়োগ প্যানেলের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে চূড়ান্তভাবে যেসব ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ পাবেন তাদের ২২ জানুয়ারি থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হবে। দলীয় পরিচিতি পাওয়া ব্যাংক কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার তালিকায় রাখার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি আমি পুরোপুরি জানি না। ইসির নির্দেশনা ও নীতিমালা অনুযায়ী ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে।’
জানা গেছে, গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র ও দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৯টি ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা অনুযায়ী ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও ভোটকক্ষ অনুযায়ী দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৯ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে। আর পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে চার লাখ ৯৪ হাজার ৯৯৮ জন। সব মিলিয়ে এ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন সাত লাখ ৮৫ হাজার ২৭৬ জন।
ইসির কয়েকটি অঞ্চল ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অনেক জেলায় ইসলামী ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম সম্ভাব্য তালিকায় রাখা হয়েছে। তারা জানান, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়, মাতৃত্বকালীন ছুটি, অসুস্থতা, হার্টের রোগীসহ বিভিন্ন কারণে অনেককে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এসব কারণে কর্মকর্তা স্বল্পতা দেখা দিলে ওইসব ব্যাংক থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। তারা আরও জানান, বিগত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হবে না। এছাড়াও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের যে প্যানেল করা হয়েছে, তা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।
জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ব্যাংকের মালিকানায় বিএনপির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতার পরিবারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকের মালিক ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা বর্তমানে কারাবন্দি সালমান এফ রহমান। যদিও ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটির পরিচালনা বোর্ড পরিবর্তন করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম গ্রুপের আব্দুস সামাদ লাবু। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এক সময়ে মালিক ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল। পরে ব্যাংকটির মালিকানায় আসেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরাও। মালিকানার কারণে এসব ব্যাংক দলীয় পরিচিতি পায়। এমনকি দলীয় দৃষ্টিতে এসব ব্যাংকে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকায় দোহার উপজেলার ইসলামী ব্যাংকের জয়পাড়া শাখার ১৬ জনকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগের জন্য তালিকায় রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ জন সহাকারী প্রিজাইডিং ও ছয়জন পোলিং কর্মকর্তা। একই ব্যাংকের নবাবগঞ্জ শাখার ১৭ জন, কেরানীগঞ্জের বাস্তা শাখার দুজনকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার সম্ভাব্য তালিকায় রাখা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের কেরানীগঞ্জের জিনজিরা শাখার ৩৯ জন ও সাভার বাসস্ট্যান্ড শাখার ১৪ জন এ তালিকায় রয়েছেন।
একইভাবে ঢাকা ব্যাংকের ঢাকাস্থ জয়পাড়া শাখার ৯ জন কর্মকর্তাকে প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগের জন্য তালিকায় রাখা হয়েছে। কেরানীগঞ্জে আইএফআইসি ব্যাংকের কলাতিয়া শাখার একজন কর্মকর্তাকে সহকারী প্রিজাইডিং হিসাবে নাম রাখা হয়েছে। এই ব্যাংকের সাভার শাখার দুই কর্মকর্তাও তালিকায় রয়েছেন।
গাজীপুরে পদ্মা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম সম্ভাব্য ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার তালিকায় রাখা হয়েছে। গোপালগঞ্জে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও আল-আরাফাহ ব্যাংক, চাঁদপুরে আইএফআইসি ব্যাংক, কুমিল্লায় ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম সম্ভাব্য ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার তালিকায় রয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ বেশ কয়েকটি জেলায় এসব ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম যুক্ত করেছেন ইসির কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির কর্মকর্তারা জানান, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর পরও সংকট থাকলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক থেকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তবে ঢাকা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। প্রয়োজন না হলে এসব ব্যাংক থেকে নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়ে মৌখিক নির্দেশনা রয়েছে।