Image description

 বিষাক্ত রেকটিফাইড স্পিরিট (শোধিত অ্যালকোহল) পান করে গত তিন দিনে ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে রংপুরজুড়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। এসব ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ ছাড়া, আরও কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, হোমিওপ্যাথিক দোকান থেকে সংগ্রহিত এই ‘ওষুধ’ কীভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে। পুলিশের অভিযানে একজন মাদকব্যবসায়ী আটক হলেও, এই চক্রের মূল হোতাদের গ্রেফতার না করায় প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের তৎপরতা নিয়ে। তবে পুলিশ বলছে, গোয়েন্দা তৎপরতা ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

গত রোববার (১১ জানুয়ারি) দিবাগত মধ্যরাতে বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরহাট এলাকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী জয়নুল আবেদিনের বাড়িতে স্পিরিট পান করে ঘটনাস্থলে মারা যান বদরগঞ্জের গোপালপুর ইউনিয়নের বসন্তপুর গ্রামের আলমগীর হোসেন (৪০), পূর্ব শিবপুর গ্রামের সোহেল মিয়া (৩০) এবং সদর উপজেলার সাহাপুর গ্রামের জেন্নাদ আলী (৩৫)।

এছাড়া মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) মধ্যরাতে বদরগঞ্জের পূর্ব শিবপুর গ্রামের আব্দুল মালেক এবং রংপুর সদর উপজেলার শ্যামপুর বন্দর কলেজ পাড়ার রাশেদুল ইসলামের মৃত্যু হয়। একই ধরনের আরেক ঘটনায় সন্ধ্যায় নগরীর হাজিরহাট থানার বালারবাজারে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সদর কোতয়ালি থানার শিবের বাজার পশ্চিম হিন্দুপাড়ার মানিক চন্দ্র রায় (৬০)।

এসব ঘটনায় নগরী ও বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বদরগঞ্জের একটি গ্রামের বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, এলাকায় উঠতি বসয়ীরা থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী অনেকেই এসব পান করছেন। পুলিশের তৎপরতা তেমন না থাকায় দেদারসে বিক্রি হচ্ছে এসব মরণঘাতী ওষুধ। প্রতিরোধের জন্য হোমিও দোকানগুলোতে কড়া নজরদারি, জনসচেতনতা ও আইন প্রয়োগ জরুরি। অন্যথায় এই ‘নীরব ঘাতক’ আরও প্রাণ কেড়ে নেবে।

রংপুর মহানগর পুলিশের হাজিরহাট থানার ওসি আজাদ রহমান জানান, এ ঘটনায় বদরগঞ্জ ও হাজিরহাট থানায় পৃথক দু’টি মামলা হয়েছে। জয়নুল আবেদিনকে গ্রেফতারের পর তার বাড়ি থেকে ১০ বোতল রেকটিফাইড স্পিরিট উদ্ধার করা হয়েছে।

রংপুর পুলিশ সুপার মারুফাত হোসাইন বলেন, স্থানীয় এক শ্রেণির হোমিওপ্যাথিক চেম্বার থেকে মাদক ব্যবসায়ীরা এই স্পিরিট সংগ্রহ করে। নগরীর একটি হোমিও চেম্বারে গোয়েন্দা পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর যৌথ অভিযান চালিয়েছে। এ সময় তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

জানা গেছে, রেকটিফাইড স্পিরিট মূলত ৯৫.৬% ইথাইল অ্যালকোহলের শোধিত মিশ্রণ, যা শিল্প, ল্যাবরেটরি ও হোমিওপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে এটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু অবৈধভাবে মিথানল মিশিয়ে মদ্যপানের জন্য বিক্রি হয়, যা অত্যন্ত বিষাক্ত। মিথানল বিষক্রিয়ায় অন্ধত্ব, কিডনি-লিভার বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটে। তবে এটিকে স্থানীয়ভাবে মাদক হিসেবে গ্রহণ করছেন অনেকেই। সারাদেশে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। রংপুরেই গত একবছরে ১০৭৯ অবৈধ স্পিরিট উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক আব্দুল আহাদ জানান, মাত্র ১০ মিলিলিটার মিথানল অন্ধত্ব ঘটাতে পারে, আর ৩০ মিলিলিটার মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুসারে, এশিয়ায় মিথানল পয়জনিংয়ের হার সর্বোচ্চ, যেখানে মৃত্যুর হার ২০-৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে ১৯৯৮-২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৯টি মিথানল গ্যাস পয়জনিংয়ে ২৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, মৃত্যুর হার ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ। রাজশাহী অঞ্চলে ২০০৪-২০১৭ সালে ১২ হাজার ১২৬টি অ্যালকোহল পয়জনিং কেস রেকর্ড হয়েছে। ২০২০ সালে রংপুর-দিনাজপুরে ১৩ জন মারা যান। এছাড়া, ২০২১ সালে বগুড়ায় ১৬ জন এবং ২০২৫ সালে রাজশাহীতে চার জনের মত্যু হয়। মেডেকিন্স স্যায়েন্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) এর ডাটা অনুসারে, বাংলাদেশ ‘রেড লিস্টে’ রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, হোমিওপ্যাথিক ওষুধালয়গুলো এই স্পিরিটের প্রধান সোর্স, যা অবৈধভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছায়। নারকোটিক্স কন্ট্রোল অ্যাক্ট ২০১৮ অনুসারে অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু কালোবাজার অব্যাহত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ ডিস্টিলারি বা মদের কারখানাতে মিথানল মেশানো হয় খরচ কমাতে, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ।