Image description

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, দীর্ঘ দেড় দশক পর তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক ভোটের প্রত্যাশা এবং তরুণ ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি সব মিলিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হয়ে উঠেছে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা।

এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি বা ‘কিংমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে দেশের তরুণ সমাজ। দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকা এবং নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ায় এবার প্রায় সাড়ে চার কোটি তরুণ ভোটার ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক মত প্রকাশ করতে প্রস্তুত।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই তরুণ জনগোষ্ঠী যদি সক্রিয়ভাবে ভোটকেন্দ্রে যায়, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে।

ভোটারের পরিসংখ্যান : তরুণদের সংখ্যাগত শক্তি

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেশে মোট ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩ জন। নির্বাচন কমিশনের ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ভোটার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জনে। অর্থাৎ গত ১৭ বছরে ভোটার বেড়েছে প্রায় ৪ কোটি ৬৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ভোটার প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী এই বয়সসীমাকেই ‘যুব’ বা তরুণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইসির বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারই প্রায় ৪ কোটি ৩২ লাখ। এর মধ্যে ১৮-২১ বছর বয়সী নতুন ভোটার : ৮৫ লাখের বেশি; ২২-২৫ বছর বয়সী : প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ; ২৬-২৯ বছর বয়সী: প্রায় ১ কোটি ২১ লাখ; ৩০-৩৩ বছর বয়সী: প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ।

অর্থাৎ দেশের মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ জনগোষ্ঠী- যারা যেকোনো নির্বাচনী আসনের ফলাফল পাল্টে দেয়ার সক্ষমতা রাখে।

কেন এবার তরুণরা ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’?

২০০৮ সালের পর গত ১৭ বছরে তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বড় একটি অংশের তরুণ কার্যত ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, অংশগ্রহণ সঙ্কট ও আস্থার ঘাটতির কারণে বহু তরুণ জীবনের প্রথম ভোট দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেকের বয়স ইতোমধ্যে ৩০ পেরিয়ে গেছে, অথচ তারা এবারই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং আত্মত্যাগ রাজনৈতিক সচেতনতা আরো তীব্র করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান মো: আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটার গ্রুপটি এবার সবচেয়ে প্রভাবশালী। রাষ্ট্র কিভাবে চলবে, তা নিয়ে তাদের আগ্রহ অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভগের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান মনে করেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। তরুণ ভোটারদের বড় অংশ শুধু দর্শক ছিল না- তাদের অনেকেই আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, কেউ কেউ বন্ধু বা স্বজন হারিয়েছেন। ফলে রাজনীতি তাদের কাছে এখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ। তাদের তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার নির্বাচন, সংস্কার ও ন্যায়বিচার।

তিনি আরো বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের খবর মুহূর্তেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এটি তরুণদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে, যার প্রতিফলন জাতীয় নির্বাচনেও দেখা যেতে পারে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার জেসমিন টুলি বলেন, ‘২০২৪ সালের যে পরিবর্তন, এবারের ভোটও সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা। তরুণ ভোটার সংখ্যায় ও সচেতনতায় অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এগিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের প্রত্যাশা বুঝতে হবে।’

তার মতে, তরুণরা প্রার্থী, ইশতেহার ও কর্মসূচি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেবে। অনেকেই এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি- যা নির্বাচনকে আরো অনিশ্চিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলছে।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বার্তা ও জাতীয় রাজনীতি

জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ডানপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর জয় জাতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তরুণদের মনোজগতের একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তরুণ ভোটার যেদিকে ঝুঁকবে, ফলাফলও সেদিকেই যাবে। তবে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল থেকে জাতীয় নির্বাচনের ফল নিশ্চিতভাবে অনুমান করা যায় না।

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের প্রতিফলন নাও হতে পারে, তবে তরুণ ভোট যে বড় প্রভাব ফেলবে- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

প্রার্থীদের কাছে তরুণদের প্রত্যাশা কী?

তরুণ ভোটাররা এবার আবেগের চেয়ে যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১০ জন তরুণ ভোটারের সাথে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের প্রত্যাশার ভিন্ন ভিন্ন দিক।

১. গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদ বলেন, তিনি এমন প্রার্থী চান যিনি সংসদে জনগণের কথা বলবেন এবং কর্তৃত্ববাদ সমর্থন করবেন না।

২. কর্মসংস্থান ও মেধার মূল্যায়ন : চাকরি প্রত্যাশী মামুনুর রশীদ চান মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও বাস্তবসম্মত কর্মসংস্থান পরিকল্পনা।

৩. নিরাপদ ক্যাম্পাস ও নারী নিরাপত্তা : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন নারী নিরাপত্তা ও সাইবার সুরাকে অগ্রাধিকার দিতে চান।

৪. ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা : নতুন ভোটার গৌতম কুমার সরকার নিরাপদ ধর্মচর্চা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

৫. আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও ভিসা সঙ্কট : উচ্চশিক্ষার্থী সাদ বাংলাদেশের বৈশ্বিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেন।

৬. দ্রব্যমূল্য ও বাজার নিয়ন্ত্রণ : সরোয়ার শুভ চান সিন্ডিকেট ভেঙে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক।

৭. প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অধিকার : সাব্বির রহমান ইন্টারনেট স্বাধীনতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা চান।

৮. শিক্ষা ও গবেষণা বাজেট : বুয়েটের শিক্ষার্থী সিফাতুল ইসলাম গবেষণা বরাদ্দ ও শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করেন।

৯. দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন : তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেন।

১০. কৃষি ও স্থানীয় উন্নয়ন : ঝিনাইদহের এক তরুণ ভোটার কৃষি ব্যয় কমানো ও টেকসই উন্নয়ন চান।

তরুণ ভোটার ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিকভাবে সচেতন তরুণ সমাজ পেয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে তারা দল ও প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরো তথ্যভিত্তিক হচ্ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ এই প্রজন্ম প্রার্থীদের অতীত রেকর্ড, আর্থিক স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক অবস্থান দ্রুত যাচাই করতে সক্ষম। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে যারা স্বচ্ছতা, সুশাসন ও তারুণ্যের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করতে পারবে তারাই এগিয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি তরুণ ভোটারদের হাতেই। প্রায় ৪ কোটি তরুণের এই ‘পাওয়ার প্লে’ দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো বাংলাদেশ।