বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে করোনাকালীন ১২ হাজার কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সালমান এফ রহমানের ১৭টি প্রতিষ্ঠানসহ অন্তত ৩১টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা, যারা পণ্য রপ্তানি করলেও দেশে নিয়ে আসেনি টাকা।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তে উঠে এসেছে, করোনাকালীন গার্মেন্ট-পণ্য ও মাস্ক রপ্তানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে সালমান এফ রহমানের পরিবারের সদস্যরা। তারা ১৭টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব টাকা পাচার করেন। এ ঘটনায় সালমান এফ রহমানসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দিয়েছেন সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা জানান, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন ১৭ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় বেক্সিমকো গ্রুপ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সেই ঋণের টাকায় গার্মেন্ট-পণ্য ও মাস্ক উৎপাদন করে তা রপ্তানি করে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে রপ্তানি আয়ের টাকা দেশে আনার ঘোষণা ছিল বেক্সিমকো গ্রুপের। পণ্য পাঠানো হলেও মূল্য বাবদ ৯ কোটি ৬৯ লাখ ৬৬ হাজার ৮০২ দশমিক ২৮ ইউএস ডলার দেশে ফেরত আসেনি। যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ফেরত না আনা রপ্তানি পণ্যের আয়ের টাকা দুবাইয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে বেক্সিমকো গ্রুপ। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৭টি মামলা করে সিআইডি।
২০২০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- স্কাইনেট এপারেলস লিমিটেড, আরবান ফ্যাশনস, অটাম লুপ এপারেলস লিমিটেড, এপোলো এপারেলস লিমিটেড, এডভেঞ্চার গার্মেন্টস লিমিটেড, পিঙ্ক মেকার গার্মেন্টস লিমিটেড পিয়ারলেস গার্মেন্টস লিমিটেড, মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেড, কাঁচপুর এপারেলস লিমিটেড, কোজি এপারেলস লিমিটেড, বেক্সটেক্স গার্মেন্টস লিমিটেড, কসমোপলিটন এপারেলস লিমিটেড, স্প্রিংফুল এপারেলস লিমিটেড, উইন্টার স্প্রিট গার্মেন্টস লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার এপারেলস লিমিটেড, এসেস ফ্যাশন লিমিটেড এবং প্লাটিনাম গার্মেন্টস লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডেরও সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান।
৮ জানুয়ারি আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ একাধিক পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সিআইডি।
সংস্থাটির অনুসন্ধানে জানা যায়, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ আমদানি ও রপ্তানির ঘোষণায় গুরুতর অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘন করে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসির করপোরেট শাখা (গুলশান-১) থেকে ছয়টি এলসি বা সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে ৫৬টি রপ্তানি অনুমতিপত্র (ইএক্সপি) গ্রহণ করা হয়। এসব ইএক্সপির বিপরীতে রেডিমেড গার্মেন্ট-পণ্য রপ্তানি করা হলেও নির্ধারিত সময় পার হলেও রপ্তানিমূল্য দেশে আনা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি বৈধ আমদানি ঘোষণা প্রদান করলেও প্রকৃতপক্ষে ঘোষণা করা পণ্যের তুলনায় কম বা ভিন্ন পণ্য আমদানি করেছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২৮ কোটি ৪০ লাখ ৮৮ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, পণ্য আমদানি-রপ্তানির আড়ালে ৪১৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা পাচার করেছে বিভিন্ন খাতের ১৩টি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ফ্যাশন ক্রিয়েট অ্যাপারেলস, ইলহাম, ইমু ট্রেডিং কোম্পানি, এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন, নিউইউর চয়েস ফেব্রিক্স, সায়েম এন্টারপ্রাইজ, হপ-ইক (বাংলাদেশ) এবং বাংলা ভিনা এন্টারপ্রাইজ।