Image description

বহুবার লিখেছি। আজও লিখছি। আমার কিন্তু সাংবাদিক হওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল বিলেত প্রবাসী হওয়ার। কারণ আমার গোটা পরিবারই বিলেত প্রবাসী। বাবাও ছিলেন প্রবাসী সে আমলে। যাই হোক, মুক্তিযুদ্ধ শেষে সাংবাদিকতা পেশাকেই বেছে নিয়েছিলাম। কিছু পেতে নয়, দেশকে দিতে। বেঁচে আছি এটা এখনো বিস্ময়কর। ’৭১ সনেই মারা যাওয়ার কথা ছিল। ৭ বন্ধু মিলে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়ার সময় ২৬শে মার্চ ভোরে পাকবাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলাম। এরমধ্যে চার বন্ধুকে পাকবাহিনী ব্রাশফায়ার করে জীবন কেড়ে নেয়। আমার বাড়িতে তো কুলখানি হয়ে গিয়েছিল। সাংবাদিকতার নেশায় জীবনে কখনো আপসের চোরাগলিতে হাঁটিনি। বন্ধুবান্ধবরা বলে, তোর কি জন্ম হয়েছে শুধু বিরোধিতা করতে? আমি তাদের বলি, যা কিছু ভালো তা বলতে কসুর করি না।

সমালোচনা করলেই শাসকেরা চটে যান। ক্ষমতা দেখিয়ে কখনো জেলে নেন। কখনো দেশে ফিরতে দেন না। সেখানে আমার কী করার আছে। আমি তো এসেছিলাম সাংবাদিকতা করতে। সীমিত সুযোগের মধ্যে এখনো লড়াই করে যাচ্ছি। আমি কি এই সাংবাদিকতা চেয়েছিলাম! যেখানে সম্পাদকরা চলেন গানম্যান নিয়ে। পত্রিকা অফিস পাহারা দেয় পুলিশ। এটা কোন সাংবাদিকতা? এটা তো কোনো রণাঙ্গন নয়। 

বঙ্গবন্ধুর জমানায় চাকরি হারিয়েছি। গেজেটেড সরকারি চাকরিতে যোগ দেইনি। এরপর নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছি। দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য লিখে এরশাদ সরকারের রোষানলে পড়েছি। একাধিক মামলার আসামি হয়েছি লেখার কারণে। সাপ্তাহিক খবরের কাগজ নিষিদ্ধ হয়। আমার নামে জারি হয় হুলিয়া। পরবর্তীতে মামলায় হেরে যায় এরশাদ প্রশাসন। কাগজ চালু হয়। ফিরে আসি দেশে। তবে অনেক মূল্যও দিতে হয়। আমার ব্যক্তিগত গাড়ি ঢাকা থেকে তুলে নিয়ে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ব্রিজের উপর থেকে ফেলে দেয়া হয়। এরশাদ সাহেবের পক্ষ থেকে তৎকালীন মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন বাবলু একটি প্রস্তাব নিয়ে আসেন যা এখানে বলতে চাই না। তখনো কোনো প্রাপ্তির কাছে নিজেকে সঁপে দেইনি। আরেকটা কথা এখানে না বললেই নয়। 

এরশাদ সাহেবের জমানায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তিনি একদিন আমাকে ডেকে বললেন, আপনার বায়োডাটা নিয়ে আসুন। কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনে আপনাকে প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর দপ্তরেই কাজ করতেন। জাঁদরেল এই কূটনীতিক সাক্ষী আমি কীভাবে বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আমি তখন বিচিত্রা অফিসে গিয়ে বন্ধু মাহফুজ উল্লাহর বায়োডাটা এনে তার কাছে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, তিনি হবেন একজন যোগ্য ব্যক্তি এই পদের জন্য। এবং সেটাই হয়েছিল। কিন্তু আমার ঘনিষ্ঠদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাংবাদিক শফিক করিম সাবু সম্পর্কই ছিন্ন করেছিল। তার বিশ্বাস ছিল মাহফুজ উল্লাহ’র নাম না দিয়ে আমি তার নাম দেবো।  আজও সেকথা স্মরণ করে সে একরাশ দুঃখবোধ নিয়ে। আমার বন্ধুবান্ধবরাই শেখ হাসিনার সরকার পরিচালনায় শীর্ষ ভূমিকায় ছিলেন। দু’জনের নাম উল্লেখ করতে চাই। সৈয়দ আশরাফ এবং ওবায়দুল কাদের। একসঙ্গে ছাত্ররাজনীতি করেছি। সম্পাদকমণ্ডলীতেও ছিলাম। কিন্তু কোনোদিনই তাদের কাছে কোনো সুবিধা নিতে যাইনি। এমনকি সচিবালয় পর্যন্তও যাইনি। কারণ সে সময় আমার অ্যাক্রিডিটেশনই ছিল না।  সাংবাদিকতার বাইরে অন্য কিছু আমাকে আকৃষ্ট করে না। বরং আওয়ামী জমানায় সবচাইতে বেশি নিগৃহীত হয়েছি। দেশেই ফিরতে পারিনি আট মাস। ছাত্র অভ্যুত্থানের আগে ২রা আগস্ট তো দেশই  ছাড়তে হলো। অথচ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টা ছিলেন আমার আত্মীয়দের কেউ কেউ। জিয়া পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বরাবরই ভালো। এই সম্পর্ক দেনা-পাওনার নয়। আমি কিছু চাইতে যাইনি। তারাও আমাকে অফার করেননি। টেন্ডারে অংশ নিয়ে একটি রেডিও লাইসেন্স পেয়েছিলাম। তাও ১৪ মাস কোর্টের বারান্দায় ঘুরেছি। প্রয়াত তথ্যমন্ত্রী শামসুল ইসলাম খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে আটকে দিয়েছিলেন। ওয়ান/ইলেভেনের সরকারের সময় তা পেয়েছিলাম। 

তারেক রহমানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক চমৎকার, নির্ভেজাল- এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার সঙ্গে অনেক বিষয়ে আলোচনা করি। সমালোচনাও করি। কিন্তু কখনো বলিনি- আমি কেমন আছি, কীভাবে পত্রিকা চালাই। তারেক রহমান দেশে ফেরার আগে বিএনপি আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে খোলামেলাই বলেছিলাম- তথ্য মন্ত্রণালয় রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। বৃটেনসহ পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে এই মন্ত্রণালয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অনেকটা কলঙ্কজনক। শেখ হাসিনা সরকারের সময় এই মন্ত্রণালয় অনুগত সাংবাদিক বাহিনীর জন্ম দিয়েছে। যার মূল্য অনেকেই দিচ্ছেন এখন। কেউ জেলখানায়, অনেকেই পলাতক। কেউ কেউ খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। না পাচ্ছেন চাকরি, না পাচ্ছেন সামাজিক মর্যাদা। প্রশ্ন উঠতে পারে তথ্য মন্ত্রণালয় না থাকলে মিডিয়ার দেখভাল করবে কে? একটি মিডিয়া রেগুলেটরি কমিশন এর দায়িত্ব নিতে পারে। যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে। অনেকেই আমাকে বলেছেন- কী ব্যাপার আপনি তো আবারো সুযোগ হাতছাড়া করছেন। তাদের শুধু বলেছিলাম, আমার তো কাজ সাংবাদিকতা করা। প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কমতি নেই। অনেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। পৃথিবীর বহু দেশ তার সঙ্গে আমি সফর করেছি। তার সামাজিক ব্যবসার মিছিলে যোগ দিয়েছি।  অনেকেই তা জানেন। বিশেষ করে লামিয়া মোরশেদের নামটা এখানে বলতেই হয়। 

কারও কারও ধারণা ছিল এবার বোধ করি আমি আত্মসমর্পণ করবো। কোনো সরকারি পদে যাবো। বরং তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছি, স্যার আমি কিছু হতে চাই না। ভালো কাজের প্রশংসা করবো। খারাপ কাজের সমালোচনা। তিনি কিছুটা অবাকই হচ্ছিলেন। আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের মাধ্যমে অনেকগুলো প্রস্তাব তিনি পাঠিয়েছিলেন। বিনয়ের সঙ্গে সেগুলো ফিরিয়ে দিয়েছি। শুনেছি, তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। ১৭ মাসের ইতিহাস ঘেঁটে দেখুন- ইউনূস সরকারের প্রথম সমালোচনা আমার হাত দিয়েই হয়েছে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের দালিলিক কোনো প্রমাণ নেই- এই খবর লেখার পর অনেকেই প্রফেসর ইউনূসকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেছিলেন। তিনি তাতে রাজি হননি। 

সাংবাদিকদের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময় বৈঠকে  প্রথম শব্দটাই বলেছিলাম, আমরা লিখতে চাই, বলতে চাই। কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নিয়ে হাজির হইনি। সেখানে দেয়া এক মিনিটের বক্তৃতার একটি শব্দ নিয়ে গুরুতর আপত্তি এই সময়ের বহুল আলোচিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের। ক্ষমতার নেশায় দলটির সমর্থকেরা ভিন্ন চিন্তাকে আমন্ত্রণ জানাতে চান না। উগ্রবাদ নিয়ে কথা বলেছিলাম। জামায়াতের নাম উল্লেখও করিনি। তারপরও সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পাইনি। সমালোচনা ভালো। কিন্তু সত্যের সঙ্গে মিথ্যা জুড়ে দিয়ে অনুমান করে কারও চরিত্র হনন করা কতোটা যুক্তিগ্রাহ্য? উগ্রবাদ কারও বন্ধু হতে পারে না। আফগানিস্তানকে দেখে আমরা কিছুই কি শিখতে পারলাম না! বলে রাখি, উগ্রবাদ জামায়াতেরও বন্ধু হবে না। আমি জামায়াত নেতাদের চিনি ভালো করে। 

ডা. শফিকুর রহমান উগ্রবাদে বিশ্বাসী মানুষ নন। কিন্তু কৌশলগত কারণে তিনি অনেক কিছুই এখন মেনে নিচ্ছেন। যা একদিন ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে তার সামনে হাজির হবে। চারপাশে যা ঘটছে তা সামনে রেখেই কথা বলেছিলাম। যেহেতু জামায়াত কথা বলছে না সেজন্য একমাত্র বিকল্প বিএনপি বা তারেক রহমান। কিছু পাবার জন্য নয়। এখানে কালো কালিতে লিখে দিতে চাই। ৫৪ বছর আগে এসেছিলাম সাংবাদিকতা করতে। জীবনের শেষ দিকে এসে বলছি-সাংবাদিক পরিচয়েই মরতে চাই। অন্য পরিচয়ে নয়।

-মতিউর রহমান চৌধুরী