Image description

বাংলাদেশে গত দেড় দশকে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী বিষয় ছিল না; বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় এটি একটি সুপরিকল্পিত ও ‘কাঠামোগত অপরাধ’ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ফেসবুক পেজে এই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়।

রাজনৈতিক দমনেই ছিল গুমের প্রধান লক্ষ্য

প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ভিন্নমত দমন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল এবং তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের আড়ালে গুমকে একটি নিয়মিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আটক বা গ্রেফতারের কোনো আইনগত রেকর্ড রাখা হতো না এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে পরিকল্পিতভাবে তথ্য গোপন করা হতো।

কমিশন তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, গুমের ঘটনাগুলোর পেছনে একটি নির্দিষ্ট ‘প্যাটার্ন’ ছিল। বিশেষ করে নির্বাচন, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ছাত্র আন্দোলনের সময়গুলোতে গুমের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যেত। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ রাখার পর ভুক্তভোগীকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার বানানো হয়েছে অথবা কোনো সাজানো মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বিচারহীনতা

প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, গুমের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত ফৌজদারি আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন। ভুক্তভোগীদের পরিবারকে মামলা করতে বাধা দেয়া, ভয়ভীতি দেখানো এবং স্বাধীন তদন্তের অভাব সমাজে একটি ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ বা বিচারহীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নাগরিকরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।

সমাজ ও পরিবারে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত

তদন্ত কমিশন উল্লেখ করেছে, গুমের প্রভাব শুধু নিখোঁজ ব্যক্তির ওপরই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো চরম মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা সমাজ কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

কমিশনের সুপারিশ ও সতর্কবার্তা

ভবিষ্যতে গুমের মতো অপরাধ রোধে কমিশন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

* গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন আইন করা।

* জাতিসংঘের ‘এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স কনভেনশন’ অনুসমর্থন করা।

* একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী স্থায়ী তদন্ত ব্যবস্থা গঠন করা।

* দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।

প্রতিবেদনের শেষে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যদি এই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত না হয়, তবে বাংলাদেশের আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

শীর্ষনিউজ