চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কয়েকটি বসতঘরে একের পর এক আগুন লাগানোর রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত ও নেপথ্যের ইন্ধনদাতাদের নামও পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় জড়িত সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ স্বীকার করেছে যে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলানো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে আন্তর্জাতিক মহলে অপপ্রচার চালানোর জন্যই পরিকল্পিতভাবে এসব অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
এ নিয়ে মঙ্গলবার প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
মঙ্গলবার ষোলশহর ২ নম্বর গেটে জেলা পুলিশের সম্মেলন কক্ষে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। এতে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রেঞ্জ ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ উক্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িত ও গ্রেফতারকৃতরা নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেবল রাউজান-রাঙ্গুনিয়া নয়; সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট ও আন্তর্জাতিক মহলে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রচারণা চালানো, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করে তোলার লক্ষ্যেই পরিকল্পিতভাবে এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা। এই চক্রে ১৫-১৬ জন সরাসরি জড়িত এবং নেপথ্যে ডোনেশন ও ইন্ধনদাতা রয়েছে। তারা ভাবছে এসব করলে বিদেশে পলাতক তাদের নেতারা ফিরে আসতে পারবেন।
ডিআইজি বলেন, এর সঙ্গে জড়িত নেপথ্যের কুশীলবদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এবং এর অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ রয়েছে।
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন- মনির হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মোহাম্মদ পারভেজ। তাদের কাছ থেকে চারটি উসকানিমূলক ব্যানার, কেরোসিন তেলের দুটি কনটেইনার, কেরোসিন তেলের একটি বোতল, তিনটি খালি প্লাস্টিকের বস্তু, একটি মোবাইল ফোন, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং জব্দ করা হয়েছে।
জেলা পুলিশ জানায়, চট্টগ্রাম জেলার রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় গত ডিসেম্বরে রাতের আঁধারে কিছু দুর্বৃত্ত কয়েকটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংঘটিত করে। এতে কিছু বসতঘর আংশিক এবং কিছু বসতঘর একেবারে ভস্মীভূত হয়। ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে তৈরি ব্যানার উদ্ধার করা হয়। ব্যানারগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম এবং অর্ধশতাধিক মোবাইল নাম্বার লেখা পাওয়া যায়। রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিতভাবে ব্যানার টানিয়ে বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোকে প্রাথমিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে প্রতীয়মান হয়।
এ ঘটনার তদন্তভার হাতে নিয়ে জড়িতদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে তথ্য-উপাত্ত, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে গত ২ জানুয়ারি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কলেজ গেট এলাকা থেকে মনির হোসেন নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তার বসতঘর থেকে ৩টি খালি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়, যা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত ব্যানারের সাথে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে।
গ্রেফতার মনির হোসেন জানায়, রাঙ্গামাটির লোকমান, রাঙ্গামাটির পৌরসভার সাবেক কমিশনার ও রাউজানের একজন ব্যক্তির পরিকল্পনায় ১৫-১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও বৌদ্ধদের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতঘরে অগ্নিসংযোগ এর পরিকল্পনা করে। পাশাপাশি জনমনে বিভ্রান্তি ও ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রমূলক ব্যানার টানিয়ে রাখে।
তদন্তে আরও জানা যায়, এসব ঘটনার মাধ্যমে একদিকে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা এবং অপরদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভ্রান্তি সৃষ্টির করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চক্রান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রেফতারকৃত আসামি মনিরের পারিবারিক বিরোধ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে ব্যানারে কিছু ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বরও সংযুক্ত করা হয়।
পুলিশ জানায়, তদন্তে মূল পরিকল্পনাকারী ও ঘটনায় সক্রিয় নেতৃত্ব প্রদানকারী একজনের নাম পাওয়া যায়। তিনি স্থানীয় নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সমন্বয়কারী হিসেবে রাঙ্গামাটিতে বসবাসকারী একজনের নাম পাওয়া যায়। তিনি অন্যান্য সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ঘটনাস্থলে যাতায়াত ও সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে অগ্নিসংযোগের ঘটনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছেন। ওই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সহযোগিতা করেছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন সমর্থিত সাবেক এক কমিশনার। তবে পুলিশ তদন্তের স্বার্থে তার নাম ইন্ধনদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের নাম এখনই জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।
পুলিশ আরও জানায়, অভিযুক্ত মনিরের পারিবারিক বিরোধ ও বিপুল অংকের টাকা প্রাপ্তির প্রলোভনে উক্ত পরিকল্পনায় তিনি অংশগ্রহণ করেছেন এবং পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক অন্যান্য সহযোগীদের সঙ্গে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কয়েকটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ ঘটাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি রাউজান-রাঙ্গুনিয়ায় সংঘটিত ঘটনার আদ্যোপান্ত বিবরণ দিয়ে ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও প্রদান করেছেন। আটককৃতদের দেওয়া তথ্যমতে অন্য সহযোগীদের গ্রেফতারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানানো হয়।
যাদের ঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে
রাউজান পৌরসভার সুলতানপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে গত ২৩ ডিসেম্বর ভোরে বাইরে থেকে দরজা আটকে একটি বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘরটি ছিল কাতার প্রবাসী সুখশীল নামের এক ব্যক্তির। সেখানে তার বোন ও বোন জামাই অনিল শীল থাকেন। এর আগে গত ২০ ডিসেম্বর ভোররাতে একইভাবে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ঢেউয়াপাড়া এলাকায় বিমল তালুকদার ও রুবে দাশ নামে দুই ব্যক্তির বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। আগুন লাগার বিষয়টি টের পেয়ে বাসিন্দারা ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে বাইরে থেকে দরজা আটকানো থাকার বিষয়টি বুঝতে পারেন। দুটি বসত ঘরই দরজার বাইরে থেকে কাপড় দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। আর উঠানে কেরোসিন লাগানো কাপড় পড়ে থাকতে দেখা যায় বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
১৯ ডিসেম্বর ভোররাতে কেউটিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডে সাধন বড়ুয়া ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সোনা পাল ও কামিনী মোহন পালের বসতঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই দিনও উঠান থেকে কেরোসিন মিশ্রিত কাপড়, বিভিন্ন নেতা ও সরকারের ঊর্ধ্বতনদের নাম ও মোবাইল নম্বর লেখা কাগজ উদ্ধার করে পুলিশ।
২৬ ডিসেম্বর রাতে রাউজানের গহিরা বাজারে একটি কাপড়ের ভ্যানে আগুন দেওয়ার সময় কেরোসিনের বোতলসহ মো. মোরশেদুল আলম (৫৫) নামে একজনকে হাতেনাতে ধরা হয়।