পৃথিবীর শক্তিধর দেশ ও তার মদতপুষ্ট রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে একাই লড়াই করছে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দেশ ইরান। একদিকে আধুনিক রণসাজে সজ্জিত সামরিক শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদের কৌশলী অস্ত্র নিয়ে নিঃসঙ্গ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। যুদ্ধের পঞ্চম দিনেও তেহরান ও এর আশপাশের শহরে ব্যাপক বোমা হামলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর, বুধবার তেহরানের বিভিন্ন স্থান থেকে বিকট শব্দ শোনা গেছে। হামলা জোরদার করায় ইরানে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএনএনএ) জানিয়েছে, ইরানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০০ জনে। এদিকে শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানের একটি জাহাজ লক্ষ্য করে সাবমেরিন থেকে হামলা চালানো হয়েছে। এতে জাহাজে থাকা ৭৮ জন আহত হয়েছেন। নিখোঁজ হয়েছেন ১০০ জন। ইরানের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সৈন্য নামিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ হাজার সৈন্য এই অভিযানে কাজ করছে। অন্যদিকে ১ লাখ সৈন্য নামানোর কথা জানিয়েছে ইসরাইল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি তেহরানের সামরিক সক্ষমতা দিন দিন কমে আসছে। তবে ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস- আইআরজিসি জানিয়েছে, উন্নত অস্ত্রগুলো এখনো তাদের মজুতে রয়েছে। মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। মঙ্গলবার দিনগত রাতে ইসরাইলের রাজধানী লক্ষ্য করে ব্যাপক ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে তেহরান। পাশাপাশি কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে দেশটি। এ ছাড়া সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর (সিআইএ) স্টেশনেও হামলা চালানো হয়। এতে সৌদি কড়া বার্তা দিয়েছে। কঠোর জবাব দেয়ার অঙ্গীকার করেছে দেশটি। দিন দিন ইরানের জন্য লড়াইটা বেশ কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাস্তবতাও অনেকটা তেমন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলে জোরালো হামলার মধ্যে বুধবার ভূমধ্যসাগরে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। ওদিকে সাইপ্রাসে রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য। সবমিলিয়ে আমেরিকা-ইসরাইল, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে হার না মানা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। দেশটি কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছে।
চাপে ট্রাম্প: তবে ইরানের এই হার মানা মনোভাবে বেশ চাপে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের প্রথম চার দিনেই তার প্রশাসনকে ২০০ কোটি ডলার অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওয়ার রেজ্যুলুশন অ্যাক্টের অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে ডেমোক্রেটরা। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্প্রসারণের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছে কংগ্রেস। এ সপ্তাহেই বৈঠকে বসছে তারা। সেখানে সিনেটে ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলুশন এবং প্রতিনিধি পরিষদ দু’টি ভিন্ন প্রস্তাব বিবেচনা করবে। যদি কংগ্রেস এসব প্রস্তাব অনুমোদন দেয়, তাহলে ট্রাম্পের ক্ষমতা হ্রাস পাবে। সিনেটে প্রস্তাবটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভার্জিনিয়ার ডেমোক্রেট দলীয় সিনেটর টিম কেইন। এটি ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলুশন আইনের অধীনে আনা হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি হয়েছিল এই আইন। যদি এই প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাহলে কংগ্রেস অনুমোদন না দিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্রবাহিনীর যুদ্ধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। টিম কেইন বলেন, সংবিধান অনুযায়ী কংগ্রেসের ভোট ছাড়া আমাদের যুদ্ধ করা উচিত নয়। আমাদের সেনাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই আমাদের দ্রুত ওয়াশিংটনে ফিরে এসে এ বিষয়ে ভোট দেয়া উচিত। এ ছাড়া সাধারণ মার্কিনিরাও ট্রাম্পের এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাব পছন্দ করছেন না। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক জরিপ জানিয়েছে, মাত্র ২৫ শতাংশ মার্কিনি ইরানে ট্রাম্পের হামলা সমর্থন করছেন। অর্থাৎ বেশির ভাগ আমেরিকানই ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে সায় দিচ্ছে না। এমন অসমর্থিত পদক্ষেপের ফলে নিজ দেশের জনগণের কাছে ট্রাম্প অজনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের এই অজনপ্রিয়তা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ চাপে আছেন ট্রাম্প। যুক্তরাজ্য সরাসরি এই যুদ্ধে না জড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। স্পেনও যুক্তরাজ্যের পথেই হাঁটছে। দেশটি তাদের ঘাঁটি ব্যবহারে ট্রাম্পের আহ্বান সরাসরি নাকোচ করে দিয়েছে। এতে ট্রাম্প অবশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়েছে দেশগুলো।
ইরানে ২ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা: ইরানে গত শনিবার অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় একটি সাবমেরিনসহ ইরানের ১৭টি রণতরী ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় কুপার বলেন, এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ হাজারের বেশি সেনা, ২০০ যুদ্ধবিমান, দু’টি বিমানবাহী রণতরী এবং বোমারু বিমান অংশ নিচ্ছে। আমাদের সক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। কুপার বলেন, আমরা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছি এবং তাদের শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, লঞ্চার ও ড্রোন ধ্বংস করেছি।