Image description

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সামরিক উত্তেজনার জেরে বিশ্ববাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অনিশ্চয়তার প্রভাব ইতোমধ্যে তেলের দামে প্রতিফলিত হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বুধবার (৪ মার্চ) ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ১১ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক ৫৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ৩৭ ডলারে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন ও রফতানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এই মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে হামলা ও ট্যাংকার চলাচলে বিঘ্নের কারণে বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে নৌ-এসকর্ট দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও বাজারে অনিশ্চয়তা কাটেনি। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

শুধু জ্বালানি নয়, সামগ্রিক আমদানি-রফতানি বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকি এড়াতে রুট পরিবর্তন বা বুকিং স্থগিত করছে। একইভাবে কিছু এয়ারলাইনও আকাশপথে বিকল্প রুট ব্যবহার শুরু করেছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হলে তৈরি পোশাকসহ রফতানিমুখী খাতগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে। অপরদিকে আমদানি ব্যয় বাড়লে ডলার চাহিদা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের জন্য তা কেবল জ্বালানি ব্যয়ের চাপই নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

আকাশপথে কার্গো সংকট, পণ্য আটকা

যুদ্ধ শুরুর পর কাতার, কুয়েত, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন ঢাকা থেকে কার্গো পরিবহন স্থগিত করেছে। ফলে তৈরি পোশাকসহ প্রায় ১ হাজার ২০০ টনের বেশি রফতানি পণ্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

ঢাকা থেকে যেসব এয়ারলাইন এখনও চলাচল করছে, তারাও কার্গো বহন সীমিত করছে। এতে জরুরি চালান, বিশেষ করে ঈদ-পূর্ব ছোট আকারের পোশাক রফতানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা আপাতত পণ্য পাঠাতে নিষেধ করছেন।

সমুদ্রপথে বুকিং বন্ধ, হাজারের বেশি কনটেইনার আটকা

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার পর মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনার পরিবহনের নতুন বুকিং স্থগিত করেছে শিপিং লাইনগুলো। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর, বেসরকারি কনটেইনার ডিপো, শ্রীলঙ্কার কলম্বোসহ বিভিন্ন বন্দরে এক হাজারের বেশি কনটেইনার আটকে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বের বৃহৎ শিপিং কোম্পানি মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের শত শত কনটেইনার আটকে আছে এবং নতুন বুকিং নেওয়া হচ্ছে না।

আটকে থাকা কনটেইনারে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত মাছ, পানীয়, প্লাস্টিক পণ্যসহ নানা ধরনের রফতানি সামগ্রী রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই অচলাবস্থা চললে ছোট ও মাঝারি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আর্থিক সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও বাংলাদেশের ঝুঁকি

পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল পরিবহন হয়। ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—এই সাত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই পথনির্ভর।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই দেশগুলো থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য।

বাংলাদেশের আমদানি করা অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই রুট দিয়ে আসে। ফলে প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে জ্বালানি সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।

তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির শঙ্কা

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে বাড়তির দিকে। এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানির দামও ঊর্ধ্বমুখী। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিসিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, যুদ্ধের ব্যাপ্তি বড় আকার ধারণ করেছে। কত দিন চলবে, তা অনিশ্চিত। প্রাথমিকভাবে আমদানি-রফতানিতে সমস্যা দেখা দিলেও জ্বালানি সরবরাহ বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিকল্প উৎস থেকে তেল-গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা আগেই প্রস্তুত রাখা দরকার।

উৎপাদন খরচে চাপ, কাঁচামাল আমদানিতে জট

পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে তুলা ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে উঠলে মিল ও কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়বে। বিকল্প রুট হিসেবে চীন, মালয়েশিয়া বা হংকং ব্যবহার করলে সময় ও ব্যয়— দুটিই বাড়বে।

প্লাস্টিকশিল্পের কাঁচামাল পেট্রোকেমিক্যাল আমদানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর শত শত কনটেইনার বিভিন্ন বন্দরে আটকে আছে। নতুন করে ক্রয়াদেশও কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

খাদ্যপণ্য ও কৃষিপণ্যে প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যে গ্রীষ্ম মৌসুমের আগে বাংলাদেশ থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেশি সবজি ও ফল রফতানি হয়। বর্তমানে ওই অঞ্চলে ফ্লাইট ও জাহাজ চলাচল সীমিত থাকায় প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত মাছ ও কৃষিপণ্যের চালান পাঠানো যাচ্ছে না। দ্রুত সমাধান না হলে পণ্যের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ভোজ্যতেল আমদানিকারকেরা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম তেল পরিবহন ব্যয় প্রতি টনে ৮-১০ ডলার বেড়েছে। সয়াবিন ও পাম তেলের আন্তর্জাতিক দামও ঊর্ধ্বমুখী।

বিকল্প রুট ও কৌশল নিয়ে ভাবনা

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সুয়েজ খাল বা ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকলেও অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার পথ ঘুরতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ছে এবং শিপিং ভাড়া সমন্বয় করা হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, সংকট দ্রুত শেষ না হলে বড় অর্থনৈতিক অভিঘাত তৈরি হতে পারে। সরকারকে দ্রুত ব্যবসায়ী ও গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে।

কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে আপাতত কয়েক সপ্তাহের জ্বালানি মজুত রয়েছে। গমসহ কিছু খাদ্যশস্যেরও পর্যাপ্ত মজুত আছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্ক বার্তা। জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি, বিকল্প শিপিং রুট নিশ্চিত করা এবং রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ এখন সময়ের দাবি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কত দ্রুত থামবে, তা অনিশ্চিত। তবে স্পষ্ট—যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যয় বাড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। এখন প্রয়োজন দ্রুত কৌশলগত প্রস্তুতি ও নীতিগত সমন্বয়।