হামলা, পাল্টা হামলা ও সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার জেরে আকাশসীমা বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল ও ভিসা জটিলতা তৈরি হয়েছে দেশে দেশে। এতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের কর্মী পাঠানো। ইতিমধ্যে আরব আমিরাত ও বাহরাইনে দুইজন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর মিলেছে, আহত হয়েছেন আরও সাতজন। উপসাগরীয় ছয় দেশে প্রায় ৪৫ লাখ প্রবাসী কর্মীর ওপর অনেকটা নির্ভরশীল দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রবাসীদের পরিবারেও বাড়ছে উদ্বেগ-আতঙ্ক।
সরকারি হিসাবে, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) ভুক্ত ছয় দেশ- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে এই অঞ্চল থেকে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয় প্রবাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলমান সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শতাধিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। নতুন কর্মীরা নির্ধারিত সময়ে যেতে পারছেন না; আবার ছুটি শেষে কাজে ফেরার কথা থাকলেও অনেকে দেশে আটকে পড়েছেন। বিমানবন্দরে অনিশ্চয়তায় অপেক্ষা করছেন বহু প্রবাসী।
গতকাল ৪ঠা মার্চ পর্যন্ত পাঁচ দিনে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের মোট ১৭৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। যার মধ্যে শুধু বুধবারই বাতিল হয়েছে ২৫টি ফ্লাইট। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, আকাশপথ বন্ধ থাকায় ২৮শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে ২৩টি, ১লা মার্চ ৪০টি, ২রা মার্চ ৪৬টি এবং ৩রা মার্চ ৩৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভিসা ও ফ্লাইট সংক্রান্ত জটিলতা সাময়িক। কাতার ইতিমধ্যে এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়িয়েছে। অন্য দেশগুলোও একই ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। যেসব যাত্রীর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, তাদের টিকিট রি-শিডিউলের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশের মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার ও কুয়েতে ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আছে।
রেমিট্যান্সে ধাক্কার আশঙ্কা: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ এসেছে জিসিসি দেশগুলো থেকে। শুধু জানুয়ারিতেই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স। সংঘাত দীর্ঘ হলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, আয় হ্রাস ও অর্থ পাঠানো ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সরাসরি চাপে পড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মোট প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশ থেকে এসেছে প্রায় ৩৪৪ কোটি টাকা, যা মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।
বিশেষ করে রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে এসব দেশ থেকে। রমজানেই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় রেমিট্যান্সে বড় ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি আমদানিতে নতুন সংকট: যুদ্ধের প্রভাব শুধু শ্রমবাজারে নয়, জ্বালানি খাতেও পড়তে পারে। বাংলাদেশ গ্যাস ও তেলের বড় অংশ আমদানি করে। এলএনজি’র উল্লেখযোগ্য অংশ কাতার ও ওমান থেকে আসে, যা হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে আসে। বন্ধ রয়েছে হুরমুজ প্রণালি ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও সার কারখানায় সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িত না হলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত এড়ানো কঠিন। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রয়োজন হলে দ্রুত সরিয়ে আনার প্রস্তুতি রাখা এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস খোঁজা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রয়োজন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা ততই ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
শ্রমবাজার পরিস্থিতি নিয়ে সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি’র (এনআরবি) চেয়ারপারসন এম এস সেকিল চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, যেই দেশগুলোতে সমস্যা চলছে সেই সব দেশের কনস্যুলেট অফিসের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। ভিসার মেয়াদ বাড়াতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো থেকে প্রবাসীদের স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এই বিষয়ে সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দূতাবাসগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব এম টিপু সুলতান মানবজমিনকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার আমাদের বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান মেরুদণ্ড। বিশেষ করে আমাদের কর্মীর ৮০ শতাংশই সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক।
তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে এখন একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের আঘাত। কাতার যেমন ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে। এখন সৌদি আরবসহ অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভিসার মেয়াদ বা আকামার মেয়াদ বাড়াতে হবে।
টিপু সুলতান বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি আরও বিস্তৃত হতে থাকে। এটা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বা শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলবে। আমাদের অর্থনীতির মূলস্তম্ভই হচ্ছে ফরেন রেমিট্যান্স। বিশেষ করে এখন এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় আমাদের দেশের বৈদেশিক রেমিট্যান্সে এটার একটা মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়া দরকার জানিয়ে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা আমাদের প্রধানমন্ত্রী বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। যেই ভিসাগুলোর ডেট এক্সপেয়ার (মেয়াদ শেষ) হয়ে যাচ্ছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভিসার মেয়াদটা বৃদ্ধি করা বা ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করতে হবে। এই সকল বিষয়গুলোর উদ্যোগ নিলে সাময়িকভাবে কিছুটা লাঘব হবে। কিন্তু যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে ফরেন রেমিট্যান্সের একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ওদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়া প্রবাসী কর্মীদের ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে একটি বিশেষ ‘সেল’ গঠন করেছে সরকার। গত সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।
সংকটে পড়া প্রবাসী কর্মীদের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ফ্লাইট বাতিলের কারণে অনেক প্রবাসী সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না, অনেকের ভিসার মেয়াদও শেষের পথে। আমরা একটি বিশেষ সেল গঠন করেছি। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে বা মাত্র কয়েকদিন বাকি আছে, তাদের তথ্য পাওয়ামাত্রই সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। আশা করছি আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবো।
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ও প্রবাসীদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আটকে পড়া প্রবাসীদের বিষয়ে করণীয়, ভিসা সংকট এবং চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং সূত্র জানিয়েছে।