Image description
ভোটের বাকি এক মাস

“শুনেছি এ বছর দুইটা ভোট দিতে হবে। একটা সংসদ নির্বাচনের ভোট, আরেকটা গণভোট। কিন্তু সেই গণভোটটা কেন দেবো সেটাই তো বুঝি না।” এভাবেই নিজের বিভ্রান্তির কথা জানালেন সিলেট সদর উপজেলার নলকট গ্রামের বাসিন্দা আজিজুর রহমান।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ধারণা কাজ করছে। জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকলেও অনেকেই গণভোটের বিষয়ে সন্দিহান। কীসের ওপর গণভোট, তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন রেখেছেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপে।

ক্যালেন্ডারের পাতায় সময় আছে মাত্র এক মাস। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘনীভূত হচ্ছে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত। একদিকে বাজছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রণদামামা, অন্যদিকে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক ভিন্ন বাস্তবতার ‘গণভোট’। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চায়ের দোকান থেকে পাড়া-মহল্লা— সবখানেই ভোটের আলোচনা থাকলেও সেখানে সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ যতটা, গণভোট নিয়ে ধোঁয়াশা যেন ততটাই স্পষ্ট।

মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনও জানেই না গণভোটটি আসলে কীসের ওপর। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে উৎসব থাকলেও গণভোটের প্রচারণা কার্যত অনুপস্থিত।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের জোট গণভোটের পক্ষে প্রচার চালালেও বিএনপিসহ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে অনাগ্রহী।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) সকালে ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়িতে নিজ বাসভবনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “গণভোট প্রচারণার দায়িত্ব বিএনপির নয়। জনগণের দায়িত্ব ভোট দেওয়া। তারা হ্যাঁ বা না—যেটা ঠিক করবেন, সেটাই হবে।”

গণভোট কেন দেবো, বুঝি না

সিলেট সদর উপজেলার নলকট গ্রামের আজিজুর রহমানের বক্তব্যেই ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি। একই সুর সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের লোকমান তালুকদারের কণ্ঠেও। ব্যালট পেপারে ভোট দিতে অভ্যস্ত হলেও গণভোটের প্রক্রিয়াটি তার কাছে গোলমেলে।

রাজশাহী বিভাগের চিত্রও তথৈবচ। তানোর উপজেলার লালপুর এলাকার কৃষক শরিফুল ইসলাম ২০০৮ সাল থেকে নিয়মিত ভোট দিচ্ছেন। তিনি এবার কিছুটা আতঙ্কিত। তার মতে, “দুটি নির্বাচন একসঙ্গে হওয়াটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। কারণ, গণভোট নিয়ে এলাকায় কোনও আলোচনা নেই, নেই কোনও উৎসব।”

রাজশাহীর পবা উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা রকিবুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “মানুষের ভোটাধিকারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। গণভোট সেই অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মানুষ যদি জানতেই না পারে এটা কেন এবং কীভাবে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, তবে এই ভোটের সার্থকতা কোথায়?”

ঢাকায় প্রার্থীরা ব্যস্ত নিজেদের বৈতরণী পার হতে

রাজধানী ঢাকার ২০টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীরা এখন দিনরাত এক করে ফেলছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে। কিন্তু অধিকাংশ প্রার্থীর প্রচারণায় ‘গণভোট’ ব্রাত্য। প্রার্থীরা কেবল নিজের নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে নিজের প্রতীকে ভোট চাচ্ছেন। এমনকি, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর হেভিওয়েট প্রার্থীরাও এ বিষয়ে নীরব। অনেক প্রার্থী জানিয়েছেন, তারা দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।

তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। ঢাকা-৯ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী জাবেদ রাসিন তার প্রচারণায় এক নতুন কৌশল নিয়েছেন। তিনি তার লিফলেটের একপাশে নিজের প্রতীক ‘শাপলা কলি’র ভোট চাচ্ছেন, এবং অন্যপাশে গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। তার মতে, জুলাই আন্দোলনকে ধারণ করতে হলে সংস্কার প্রশ্নে গণভোটের বিকল্প নেই।

ঢাকা-১২ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আকতার এবং ঢাকা-৫ আসনে ইসলামী আন্দোলনের হাজী ইবরাহীমও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরব। কিন্তু প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির অবস্থান ভিন্ন। ঢাকা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিন স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি আপাতত কেবল নিজের প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়েই ব্যস্ত। ঢাকা-৮ আসনে দলের হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাস সরাসরি গণভোট নিয়ে কথা না বললেও তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে এক নতুন নাটকীয়তা তৈরি করেছেন।

প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিভক্তি

গণভোটের প্রচারণা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্পষ্ট ফাটল দেখা গেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তো সোমবার সকালে বলেই দিলেন, গণভোট প্রচারণার দায়িত্ব বিএনপির নয়।

বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো একে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছে। রংপুরের মাহবুবার রহমান বেলাল বা ময়মনসিংহের কামরুল আহসান এমরুলদের মতো জামায়াত প্রার্থীরা বলছেন, জুলাইযোদ্ধাদের অবদান ধরে রাখতে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত করা নৈতিক দায়িত্ব। তবে বাম দলগুলোর মধ্যে রয়েছে সংশয়। সিপিবির ত্রিদীব সাহা জানিয়েছেন, গণভোটের অনেক বিষয়ে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। আর বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা রাফিকুজ্জামান ফরিদ সরাসরি বলেই দিলেন, “গণভোটের বেশিরভাগ প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ।”

সরকারি উদ্যোগ ও বাস্তবতা

সরকারের পক্ষ থেকে মসজিদের ইমাম ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রচারণার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিভাগীয় শহরগুলোতে কর্মশালা ও ‘ভোটের গাড়ি’র মাধ্যমে প্রচারণা চললেও তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। গণভোট সংক্রান্ত প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক আলী রীয়াজ আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

সোমবার এক সভায় তিনি বলেন, “এবারের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দেশে আর কখনও ‘রাতের ভোট’ হবে না। গত ১৬ বছর নির্বাচনের নামে যেসব প্রতারণা করা হয়েছিল, সেগুলোর পথ চিরতরে বন্ধ হবে।”

তিনি বলেন, “অতীতে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম যেন দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পদ্ধতি গড়ে তোলা যায়। কিন্তু ব্যাপক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও বিগত ফ্যাসিবাদীরা নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এ ব্যবস্থাকে বাতিল করে দেয়। তবে আসন্ন গণভোটে জনগণ সম্মতি দিলে দেশে আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।”

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেন, “এ পর্যন্ত দেশে যতগুলো গণভোট হয়েছে তার থেকে এবারের গণভোট অনেকখানি ভিন্ন। বিগত সরকারগুলো ক্ষমতায় থেকে সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য গণভোট করেছিল। ছাব্বিশের গণভোটে কেউ ক্ষমতায় থেকে বাস্তবায়নের জন্য জনগণের রায় চাচ্ছে না।”

রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা আগামীতে ক্ষমতায় আসবে তারাই জনগণের রায় বাস্তবায়ন করবে।

বিভাগীয় চিত্রেও উৎসব বনাম বিভ্রান্তি

ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও সিলেট, প্রায় সব বিভাগেই ভোটারদের বক্তব্যে একই সুর। গণভোট সম্পর্কে ধারণা নেই, প্রচারণাও চোখে পড়ছে না। অনেকেই জানেন না, গণভোটে কী বিষয়ে ভোট দিতে হবে বা ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর অর্থ কী।

ময়মনসিংহের ভোটার শাহিন মিয়া ও শহীদ মিয়াদের দাবি, গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ধোঁয়াশা রয়েছে। তারাকান্দার হাসান মাহবুব মনে করেন, জুলাই চেতনা বাঁচাতে হলে নির্বাচন কমিশনকে আরও কার্যকর হতে হবে।

চট্টগ্রামের বন্দর নগরীতেও নেই কোনও জোরালো প্রচার। ভোটার জয়নাব বেগম বা রফিকুল ইসলামদের একটাই কথা তারা কেবল সংসদীয় প্রার্থীদের চেনেন, গণভোট চেনেন না। মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান আক্ষেপ করে বলেন, “জিয়াউর রহমানের আমলের সেই হেলিকপ্টারে লিফলেট বিলি আর মাইকিংয়ের প্রচার এবার কোথায়?”

বরিশাল নগরীর কাউনিয়ার শোয়াইব সাকিরের অভিযোগ আরও মৌলিক। তিনি শুনেছেন গণভোটে একাধিক বিষয়ে একসঙ্গে মত দিতে হবে। তার প্রশ্ন, “আমি সব বিষয়ে একমত না হলে কেন একভাবে হ্যাঁ বা না বলব?” সচেতন নাগরিক কমিটির রফিকুল আলম তো এই গণভোটকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও দাবি করেছেন।

খুলনার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সল কাদের গণভোটের প্রচারণার সূত্রে জাতীয় নির্বাচনের প্রচার না করার জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এদিকে, রংপুরের প্রত্যন্ত এলাকার ভোটাররা বলছেন, বড় দলগুলোর প্রার্থীরা ভোট চাইতে আসলেও গণভোটের নামটিও মুখে নিচ্ছেন না।

উদ্বেগ যেখানে

বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও এর উদ্দেশ্য ও প্রভাব ভোটারদের কাছে পরিষ্কারভাবে পৌঁছায়নি। কেউ কেউ বলছেন, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, একই দিনে দুটি ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হলেও প্রচারণার অভাবে তা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসানের মতে, অতীতে গণভোটের জন্য যে ধরনের ব্যাপক প্রচার (হেলিকপ্টার থেকে লিফলেট বিতরণ, রেডিও-টিভিতে জোরালো প্রচার) দেখা যেত, এবার তার ছিটেফোঁটাও নেই। ফলে ভোটারদের বড় একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়ে কেন্দ্র থেকে ফিরে আসতে পারে।

১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একদল মানুষের ক্ষমতায় যাওয়ার দিন নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো আমূল বদলে দেওয়ার এক সম্ভাব্য দিন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যে ভোটাররা রাষ্ট্র সংস্কারের এই বিশাল কর্মকাণ্ডের অংশীদার হতে যাচ্ছেন, তারা কি আদৌ বুঝতে পারছেন তাঁদের একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কতটা শক্তিশালী?

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোহাগ আলীর কথায় উঠে আসে চূড়ান্ত বাস্তবতা। তার ভাষ্য, “দেশের শতভাগ মানুষ শিক্ষিত না, আর গণভোটও নিয়মিত হয় না। তাই মানুষকে না বুঝিয়ে এই ভোট নেওয়াটা চ্যালেঞ্জের।”

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন—বরিশাল: সালেহ টিটু; ময়মনসিংহ: আতাউর রহমান জুয়েল; সিলেট: মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম; চট্টগ্রাম: নাসির উদ্দিন রকি; খুলনা: হেদায়েৎ হোসেন; রাজশাহী: দুলাল আবদুল্লাহ; রংপুর: লিয়াকত আলী বাদল।