Image description
 
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সড়কের পাশে পড়ে থাকা বস্তা থেকে এসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পরে র‍্যাব জানায়, উদ্ধার হওয়া এসব অস্ত্র ও গুলি চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন থানা থেকে লুট হয়েছিলফাইল ছবি

চোরাগোপ্তা হামলা, গুলি, হত্যা, বিস্ফোরণ, মব সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার—একের পর এক ঘটনা নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই গুলি করে অন্তত চারটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে নির্বাচনী জনসংযোগে হামলা, গুলি হয়েছে। সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকার অদূরে তেজতুরী বাজারে বুধবার রাতে গুলি করে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি করে তাঁর মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পান। এর আগে গতকাল সকালে শরীয়তপুরের জাজিরায় একটি ঘরে বিস্ফোরণে দুই যুবক নিহত হন। পুলিশ বলছে, ককটেল তৈরির সময় এই বিস্ফোরণ হয়। এসব ককটেল নির্বাচনী প্রচারে হামলা বা নাশকতার জন্য তৈরি হচ্ছিল কি না, সে সন্দেহও রয়েছে।

ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনার পর নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি, ভোটার, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের ভয় তৈরি হয়েছিল। তবে সেটা এখন কমে এসেছে। সম্প্রতি কিছু ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন ভন্ডুল করার মতো কোনো ঘটনা ঘটছে না। এই পরিবেশ ধরে রাখাটাই এখন চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম

এর আগে ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে একতলা ভবনের দুটি কক্ষের দেয়াল উড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঘটনাস্থল থেকে ককটেল, রাসায়নিক দ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। পুলিশ সূত্র বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মাদ্রাসা পরিচালনার নামে ভাড়া করা ওই বাড়িতে তৈরি করা বেশ কিছু বোমা এর আগে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছে।  

 
 

আবার সরাসরি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা হামলা না হলেও মব সন্ত্রাসের (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ হামলা) ঘটনা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধের অভাব তৈরি করেছে। যেমন গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে মোটরসাইকেলের সঙ্গে গাড়ির ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ‘মব’ তৈরি করে আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাস নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

 
 

১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে লক্ষ্মীপুরে দরজায় তালা লাগিয়ে ও পেট্রল ঢেলে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এতে আগুনে পুড়ে ওই নেতার সাত বছর বয়সী এক মেয়ের মৃত্যু হয়। দগ্ধ হন বিএনপি নেতাসহ তাঁর আরও দুই মেয়ে।

  

গত সোমবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একইদিন সন্ধ্যায় যশোরের মনিরামপুরে এক বরফ কল ব্যবসায়ীকে গুলি করে এবং রাত ৯টায় নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় আরেক ব্যবসায়ীকে বাড়ির ফটকে গুলি হত্যা করা হয়েছে।

ঘটনাস্থল থেকে ককটেল, রাসায়নিক দ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। পুলিশ সূত্র বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মাদ্রাসা পরিচালনার নামে ভাড়া করা ওই বাড়িতে তৈরি করা বেশ কিছু বোমা এর আগে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছে।  

এসব ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশে নতুন করে ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এসব ঘটনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারাটা ভোটের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারের পক্ষ থেকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য এলেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মবের ঘটনা ঘটছেই। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, গত বছরে এভাবে গণপিটুনি বা ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার হয়ে প্রাণ গেছে ১৯৭ জনের। ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন।

 
রিকশায় গুলিবিদ্ধ শরিফ ওসমান হাদিছবি: ফেসবুক থেকে

এর আগে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই দিনের বেলায় রাজধানীতে গুলি করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে; যা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। শহীদ ওসমান হাদির ঘটনা ও আবেগ সামনে রেখে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এ হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাশাপাশি ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা করা হয়।

অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র নিয়ে ভয়

অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে সবচেয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী শহীদ শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘিরে। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছু পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ওসমান হাদির মাথায় গুলি করা হয়। এ ঘটনার পরও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলি করে হত্যার অন্তত আটটি ঘটনা ঘটেছে।

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু হয়। ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এই অভিযানে ১৫ হাজার ৯৩৬ জন গ্রেপ্তার হন। তবে এই অভিযানেও চিহ্নিত, পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই কম। তা ছাড়া অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। এই সময়ে মোট অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ২৩৬টি।

 

তবে ঢাকার অপরাধ জগতের বড় সন্ত্রাসী বা তাদের সহযোগীদের কাছ থেকে তেমন কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। আবার যারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অস্ত্র ভাড়া দেয়, তাদের থেকেও উদ্ধারের ঘটনা খুব বেশি নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩৩৩টি এখনো উদ্ধার হয়নি। অবৈধ অস্ত্রও নির্বাচনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এর আগে গাজীপুরে ছাত্র-জনতার ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণের ঘটনার পর গত ৮ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হয়েছিল। তবে সেই অভিযানেও পেশাদার সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের হার ছিল খুবই কম। এ জন্য এবারের বিশেষ অভিযানের ঘোষণার পরও নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার পরিবেশ থেকেই যাচ্ছে।

যদিও ২১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাউকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না। দেশে দ্রুত যৌথ অভিযান শুরু হবে বলেও জানান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।

প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ

নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ রয়েছে। গোপালগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানীর একটি ভিডিও থেকে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ৭ জানুয়ারি কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মতবিনিময়কালে এই প্রার্থীকে গায়ে থাকা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট প্রদর্শন করতে দেখা যায়।

 
পাঞ্জাবির বোতাম খুলে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখাচ্ছেন গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানীছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

চাদর সরিয়ে পাঞ্জাবির বোতাম খুলে ভেতরে পরা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখিয়ে এস এম জিলানী বলেন, ‘আমাদের জীবনের হুমকি আছে, এটা সত্য। দেখেন, এখনো বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে আছি। জানি না কখন কী হয়, তাই সতর্ক থাকি।’

এর আগে গত বছরের ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসনে (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জনসংযোগে গুলি করা হয়। এতে একজন নিহত হন। এখন পর্যন্ত খুনি বা হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হয়নি। ব্যবহৃত অস্ত্রটিও উদ্ধার হয়নি।

বিদ্যমান বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে ইতিমধ্যে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ২০ জন নেতা।

 

ঝুঁকিতে নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান

হামলা, সংঘাত ও সহিংসতা ছাড়াও আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ কী ধরনের তৎপরতা চালাতে পারে, সেটা নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে ভোটের আগে আক্রমণ হতে পারে। এ জন্য এখানে বাড়তি নিরাপত্তা দিতে হবে।

ইতিমধ্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত ১৩ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। এর আগের রাতে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। ওই সময় ঢাকায় বাসে আগুন এবং বিভিন্ন স্থানে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্র বলছে, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তার মধ্যেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই ১৩ ডিসেম্বর সারা দেশে ইসির মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে নির্দেশনা দেয় ইসি। এ ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন, চার নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে ইসি।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ দুভাবে কাজ করছে। নির্বাচনের আগে যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে, সে জন্য পেশাদার অপরাধী গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার এবং নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রার্থী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়ে ভোটের দিনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা, দলগুলোতেও শঙ্কা

নির্বাচনকালীন আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা। গত নভেম্বরে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত মাসের চেয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। আবার ডিসেম্বরের শুরু থেকে এ ধরনের হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনার সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চরম ও ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে, যা ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত ও সহিংসতর হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন।

আরেক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বলছে, রাজনৈতিক সহিংসতার এই ঘটনাগুলো কখনো নিজ দলের দুটি পক্ষ এবং কখনো অন্য দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে হয়েছে।

বর্তমানে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সহিংসতার ঘটনার পাশাপাশি বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ভোট ঠেকাতে আওয়ামী লীগের হুমকিকে কেন্দ্র করে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রগুলো বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সাইবার স্পেসে আওয়ামী লীগের সমর্থক বিভিন্ন ব্যক্তি একের পর নাশকতার উসকানি ও পরিকল্পনার ঘোষণা দিচ্ছেন। গুপ্তহত্যার হুমকিও পাচ্ছেন অনেকে। আবার অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে সামনে আসছে। এতে নির্বাচন ঘিরে শঙ্কার পরিবেশ তৈরি করছে। রাজনৈতিক দলগুলোও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বক্তব্যে ও সরকারের কাছে তাদের এ উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।

সর্বশেষ গত বুধবার রাতে ঢাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল এক বিবৃতি দেন। তাতে তিনি বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে। দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে, যার নির্মম বহিঃপ্রকাশ এ হত্যাকাণ্ড। এ ধরনের সহিংসতা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে চরমভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে।

এর আগে ২১ ডিসেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর ৩০০ আসনের প্রার্থীরাও তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই একজন প্রার্থীকে গুলিবিদ্ধ করার অর্থ হলো, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা প্যাকেজ প্রোগ্রাম। আরও সিরিয়াল হয়তো করা হয়েছে।

পরিবেশ ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন ঘিরে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন জনবলকে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ইতিহাসে ‘সেরা নির্বাচন’ আয়োজন করবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তবু এ নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষ আশ্বস্ত হতে পারছে না।

এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম প্রথম আলোকে বলেন, ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনার পর নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি, ভোটার, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের ভয় তৈরি হয়েছিল। তবে সেটা এখন কমে এসেছে। সম্প্রতি কিছু ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন ভন্ডুল করার মতো কোনো ঘটনা ঘটছে না। এই পরিবেশ ধরে রাখাটাই এখন চ্যালেঞ্জ। কারণ, পরিস্থিতি কিন্তু যেকোনো সময় খারাপ হতে পারে। সেভাবেই নিরাপত্তা প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।