Image description

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মাঝেই নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন দেশটির শেষ শাহের (সম্রাট) নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, ‌‌‘‘সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভ নজিরবিহীন।’’

 

ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন গভীরভাবে আতঙ্কিত এবং বিক্ষোভ ঠেকাতে তারা ফের ইন্টারনেট বন্ধ করার চেষ্টা করছে বলে দাবি করেছেন তিনি। কে এই সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি, যিনি আবারও নিজের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন?

ইরানের ঐতিহাসিক রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে জন্মের পর থেকেই প্রস্তুত করা হচ্ছিল রেজা পাহলভিকে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের বিপ্লব যখন তার বাবার রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে, তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন।

দূর থেকেই তিনি দেখেছেন, তার বাবা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি, যিনি একসময় পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন পেয়েছিলেন, তিনি কীভাবে এক দেশ থেকে আরেক দেশে আশ্রয় খুঁজে ফিরেছেন এবং শেষ পর্যন্ত ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মিসরে মারা যান।

হঠাৎ ক্ষমতা হারানোর পর তরুণ যুবরাজ ও তার পরিবার রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে এবং নির্বাসনে জীবন কাটাতে বাধ্য হন। তখন তাদের ভরসা ছিল দিন দিন কমতে থাকা হাতে গোনা কিছু রাজতন্ত্রপন্থি ও শুভাকাঙ্ক্ষী। পরবর্তী কয়েক দশকে পাহলভি পরিবার একাধিকবার ট্র্যাজেডির মুখে পড়ে। রেজা পাহলভির ছোট বোন ও ছোট ভাই দুজনই আত্মহত্যা করেন।

ফলে, অনেকেই যেটিকে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া রাজবংশ বলে মনে করতেন, সেই বংশের প্রতীকী প্রধান হিসেবে শেষ পর্যন্ত তিনিই থেকে যান। এখন ৬৫ বছর বয়সে তিনি আবারও দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির কাছের এক শান্ত উপশহরে বসবাস করেন তিনি। তার সমর্থকদের মতে, তার জীবনযাপন বেশ সাধারণ এবং সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যান।

তার চোখে পড়ার মতো কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই এবং স্থানীয় ক্যাফেগুলোতে প্রায়ই তাকে তার স্ত্রী ইয়াসমিনের সাথে দেখা যায়। ২০২২ সালে এক পথচারী তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি নিজেকে ইরানের বিক্ষুব্ধ আন্দোলনের নেতা হিসেবে দেখেন কি না। তখন তিনি ও তার স্ত্রী একসঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন, পরিবর্তন আসতে হবে দেশের ভেতর থেকেই।

• গুরুত্বপূর্ণ বাঁক

যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলছেন। ২০২৫ সালে ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর প্যারিসে এক সংবাদ সম্মেলনে রেজা পাহলভি বলেন, ইরানের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সরকার ভেঙে পড়লে তিনি একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।

তখন তিনি একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের জন্য ১০০ দিনের একটি পরিকল্পনাও তুলে ধরেন। তার ভাষায়, এই নতুন আত্মবিশ্বাস এসেছে নির্বাসনে কাটানো অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং তার বাবার রেখে যাওয়া আনফিনিশড মিশন (অসমাপ্ত মিশন) থেকে।

প্যারিসে সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, এটি কোনো অতীত ফিরিয়ে আনার বিষয় নয়। বরং, ইরানিদের জন্য একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার বিষয়।

• রাজকীয় শৈশব

১৯৬০ সালের অক্টোবরে তেহরানে জন্ম নেন রেজা পাহলভি। তার বাবা আগেও দুটি বিয়ে করেন। কিন্তু সেই দুই বিয়েতে কোনো পুত্রসন্তান না হওয়ায় তিনি ছিলেন শাহের উত্তরাধিকারী।

তাই, রেজা পাহলভির শৈশব কেটেছে রাজকীয় সুযোগ-সুবিধার মাঝে। তিনি গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করেছেন, আর ছোটবেলা থেকেই রাজতন্ত্র রক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

১৭ বছর বয়সে তাকে যুদ্ধবিমান চালনার প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে পাঠানো হয়। কিন্তু দেশে ফিরে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বিপ্লবে তার বাবার শাসনের পতন ঘটে। এরপর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাস করছেন। সেখানে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন, আইনজীবী ও ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ইয়াসমিনকে বিয়ে করেন।

যুক্তরাষ্ট্রেই তারা তাদের তিন কন্যা নূর, ইমন ও ফারাহকে নিয়ে সংসার গড়েন।

• বিতর্কিত উত্তরাধিকার

নির্বাসনে থেকেও পাহলভি রাজতন্ত্রপন্থিদের কাছে একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে আছেন। অনেকের কাছে পাহলভি শাসনামল মানে দ্রুত আধুনিকায়ন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আবার অন্যদের স্মৃতিতে সেই সময়টি ছিল সেন্সরশিপ এবং ভিন্নমত দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত গোয়েন্দা সংস্থা সাভাকের আতঙ্ক।

বছরের পর বছর ধরে ইরানে তার জনপ্রিয়তা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৮০ সালে তিনি কায়রোতে একটি প্রতীকী রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান করেন এবং নিজেকে শাহ ঘোষণা করেন।

যদিও এর বাস্তব বা রাজনৈতিক প্রভাব ছিল খুবই সামান্য। তবে তার কিছু সমালোচকের মতে, এই ঘটনাটি গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে তার বর্তমান বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি একাধিকবার বিরোধী রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালে গঠিত ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইরান ফর ফ্রি ইলেকশনসও রয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগের বেশিরভাগই অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং ইরানের ভেতরে সীমিত প্রভাব বা যোগাযোগের কারণে কার্যকর হতে পারেনি।

প্রবাসে থাকা কিছু বিরোধী গোষ্ঠীর মতো নন তিনি। পাহলভি ধারাবাহিকভাবে সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং মুজাহিদিন-ই খালক (এমইকে)-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন।

তিনি বারবার শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থা কী হবে, তা নির্ধারণের জন্য একটি জাতীয় গণভোটের কথা বলেছেন।

• আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাহলভিকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ দেখা গেছে। ২০১৭ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় তার দাদা রেজা শাহকে স্মরণ করে রেজা শাহ, তোমার আত্মা শান্তিতে থাকুক, এমন স্লোগান আবার শোনা যায়।

২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তা তাকে আবারও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনে। ইরানের বিভক্ত বিরোধী শক্তিগুলোকে একত্রিত করার প্রচেষ্টার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে ঘিরে কিছুটা আগ্রহ তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হন।

সমালোচকদের মতে, চার দশক ধরে নির্বাসিত জীবনে তিনি এখনো শক্ত কোনো সংগঠন বা স্বাধীন গণমাধ্যম গড়ে তুলতে পারেননি। ২০২৩ সালে তার ইসরায়েল সফর নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে। সেখানে তিনি হলোকাস্ট স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

কিছু ইরানি এটিকে বাস্তববাদী কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও, অন্যদের চোখে এটি ইরানের আরব ও মুসলিম মিত্রদের দূরে সরে যাওয়ার মতো পদক্ষেপ। সম্প্রতি ইরানের ভেতরে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর তাকে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।

বিবিসির লরা কুয়েন্সবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করে এমন ইসরায়েলি হামলাকে তিনি সমর্থন করেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, সাধারণ ইরানিরা এর লক্ষ্য নন।

তার ভাষায়, শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করে দেয় এমন যে কোনো কিছুকে ইরানের অনেক মানুষ স্বাগত জানাবে। এই মন্তব্যকে ঘিরে তখন তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।

• এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

আজ রেজা পাহলভি নিজেকে শুধু সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি বলেন, তার লক্ষ্য ইরানকে মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন এবং নারীদের সমান অধিকারের পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করা এবং রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে নাকি প্রজাতন্ত্র গড়া হবে, সে সিদ্ধান্ত তিনি গণভোটের মাধ্যমে জনগণের হাতে ছেড়ে দিতে চান।

সমর্থকদের চোখে, শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের পক্ষে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির কারণে তিনি বিরোধীদের মধ্যে একমাত্র উল্লেখযোগ্য নেতা। সমালোচকদের পাল্টা যুক্তি হলো, তিনি এখনো বিদেশি সমর্থনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল। আর, কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্লান্ত জনগণ আদৌ কোনো নির্বাসিত নেতার ওপর আস্থা রাখতে প্রস্তুত কি না, সেটিও একটি প্রশ্নের বিষয়।

ইরানের সরকার রেজা পাহলভিকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করলেও, মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ ও বিশ্বাসযোগ্য জনমত জরিপ ছাড়া তার প্রকৃত সমর্থনের মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

কিছু ইরানি এখনো তার পারিবারিক নামকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। আবার অন্যদের আশঙ্কা হলো, গণতন্ত্রের মোড়কে হলেও, এতে এক অনির্বাচিত শাসকের জায়গায় আরেকজন অনির্বাচিত শাসকই এসে বসতে পারেন।

পাহলভির বাবার মরদেহ এখনো কায়রোতেই সমাহিত রয়েছে। রাজতন্ত্রপন্থিদের আশা, একদিন সেটি প্রতীকীভাবে ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। নির্বাসিত এই যুবরাজ সেই দিনটি অথবা স্বাধীন ইরানকে আদৌ দেখবেন কি না, তা এখনো অজানা। অতীতের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা এই দেশের বহু প্রশ্নের মাঝে এটিও একটি।

বিবিসি বাংলা