যোগ্যতা অর্জন করেও পদোন্নতি পাননি প্রশাসনের অন্তত ৭০০ কর্মকর্তা। এতে তাঁরা চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ। এর মধ্যে অতিরিক্ত সচিব পদে প্রায় ৩০০ জন, যুগ্ম সচিব পদেও প্রায় ৩০০ জন এবং উপসচিব পদে পদোন্নতি চান অন্তত ৭৯ জন কর্মকর্তা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ায় এই পদোন্নতি অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
তবে প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত পদোন্নতি দিতে নির্বাচনের তফসিল কোনো বাধা নয়। আর এসব কর্মকর্তা কেউই নির্বাচনসংশ্লিষ্ট নন। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন নিয়েই পদোন্নতি হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পদোন্নতির সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) প্রধান মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. শেখ আবদুর রশীদ নিজ দপ্তরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, দেখা যাক।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতিতে নিয়মিত হিসেবে ২০তম ব্যাচকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এবারের অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য প্রশাসন ক্যাডারের ২৪৪ কর্মকর্তার পাশাপাশি অন্যান্য ক্যাডার থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে পদোন্নতির জন্য প্রায় ৩০০ কর্মকর্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে এই ব্যাচের ৪৩ জন কর্মকর্তা শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিভিন্ন জেলার ডিসি এবং ৪০ কর্মকর্তা মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন। তাঁদের পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে আভাস পাওয়া গেছে।
এর বাইরে উপসচিব ও যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তার সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। সম্প্রতি সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতি পাননি বিসিএস ৩০তম ব্যাচের ৭৯ জন কর্মকর্তা। তাঁরা প্রায় সবাই পুনঃপর্যালোচনার (রিভিউ) জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। একইভাবে উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ২৪তম ব্যাচের অন্তত ১৮৩ জন কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। গত ২০ মার্চ সরকার যুগ্ম
সচিব পদে পদোন্নতি দেয় প্রশাসনের ১৯৬ জন কর্মকর্তাকে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে বিসিএস ২৪তম ব্যাচের পদোন্নতিযোগ্য ৩২০ জনের মধ্যে পদোন্নতি পেয়েছিলেন ১৩৭ জন। বাদ পড়েছিলেন পাঁচজন জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) ১৮৩ জন। এরপর বঞ্চিতরা দল বেঁধে মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. শেখ আবদুর রশীদ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোখলেস উর রহমানের সঙ্গে দেখা করে পদোন্নতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছিলেন। ওই সময় উভয় সচিবই বঞ্চিতদের দাবি মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে বঞ্চিতদের অনেকে কালের কণ্ঠকে জানান।
এ ছাড়া প্রশাসন ক্যাডারের বাইরের অন্যান্য ক্যাডারের দেড় শর বেশি কর্মকর্তা পদোন্নতিযোগ্য হলেও যুগ্ম সচিব হতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব বঞ্চিত কর্মকর্তার প্রায় সবাই পদোন্নতি চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে পুনঃ পর্যালোচনা (রিভিউ) করছে পদোন্নতির জন্য সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ এসএসবি। এ নিয়ে কয়েকটি সভাও করেছে এসএসবি। তবে যাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগে দুদকে ও বিভাগীয় মামলা আছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) বা জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে দায়িত্বশীল একটি সূত্র আভাস দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বঞ্চিত একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রীর আস্থাভাজন পিএসরাও পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ আমি না ছিলাম কারো পিএস, না ছিলাম কোনো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে। আমার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির মামলাও নেই। কী কারণে আমাকে বঞ্চিত করা হলো তার কিছুই জানি না। রিভিউ চেয়ে আবেদন করেছি। স্যাররা নিশ্চয় এবার বিবেচনা করবেন।’
এ প্রসঙ্গ জানতে চাইলে প্রশাসন বিষয়ক বহুগ্রন্থের প্রণেতা সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের সময়মতো পদোন্নতি দেওয়া উচিত। নইলে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। প্রশাসনিক কাজকর্ম বিঘ্নিত হয়। হতাশাগ্রস্ত একটি প্রশাসনের জন্ম হয়। নির্বাচনের তফসিল নিয়মিত পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। পদোন্নতির সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্কও নেই। যাঁরা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাঁদের বিষয়টি ভিন্ন। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের অনুমতি নিয়ে হলেও সময়মতো যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে হবে।’