Image description

‘থাকবে পুলিশ জনপদে, ভোট দেবেন নিরাপদে’ স্লোগান নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। তবে নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে যানবাহনসংকট। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পুলিশের গাড়িবহরে ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। 

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে চার হাজারের বেশি যানবাহনের ঘাটতি রয়েছে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে দেশে ৪৬০টি থানায় অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালানো হয়। পুলিশের ৫২৬টি সরকারি গাড়ি আগুনে পোড়ানো হয়। আরো ৫৩৩টি গাড়ি ভাঙচুর করে অকেজো করা হয়। সব মিলিয়ে এক হাজার ৫৯টি যানবাহন সম্পূর্ণ ভস্মীভূত ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
 
এ ক্ষেত্রে ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা। এই বিপুল যানবাহন বিকল হওয়ায় পুলিশের দৈনন্দিন টহল ও অপরাধ দমন কার্যক্রম শুরুতেই বড় ধরনের হোঁচট খাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর গতিশীলতা নির্ভর করে তার পরিবহনের ওপর, যা বর্তমানে অনেকটা পঙ্গু অবস্থায় রয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যমান যানবাহনগুলোর বড় অংশ জীর্ণ দশায় রয়েছে।

পুলিশের পরিবহন নীতিমালা অনুযায়ী, একটি গাড়ি সর্বোচ্চ আট বছর চালানোর কথা থাকলেও পুলিশের বহরে থাকা অনেক গাড়ি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাস্তায় চালানো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এসব ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ গাড়ি জোড়াতালি দিয়ে পুলিশ টহলের কাজ চালাচ্ছে। এসব গাড়ি একবার নষ্ট হলে কারখানায় মাসের পর মাস পড়ে থাকে। বারবার মেরামতের ফলে সরকারের রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বাড়ছে। গাড়িগুলো দীর্ঘ মেয়াদে কাজে আসছে না।
 
পুলিশের গাড়ির এই জরাজীর্ণ অবস্থা রাজধানীতেও দেখা যায়।

অভিজ্ঞ পুলিশ সদস্যরা জানান, দেশের কয়েক হাজার ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যালট পেপার পরিবহন, ব্যালট বাক্স নির্দিষ্ট সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছানো, প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের নিরাপত্তা দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয় পুলিশকে। এ ছাড়াও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দাঙ্গা দমন বা জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত চলাচলের জন্য কয়েক হাজার সচল পিকআপ ভ্যান ও বড় ট্রাকের প্রয়োজন হয়। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বিদ্যমান জীর্ণ গাড়ি নিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে বিশাল দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। ডিএমপির একটি থানার একজন ওসি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের থানায় আগে যে গাড়ি ছিল, তার অর্ধেকই এখন নেই। নতুন করে তিনটি গাড়ি পেলেও তা দৈনন্দিন কাজের জন্য যথেষ্ট নয়। নির্বাচনের সময় যখন আমাদের জনবল ও মুভমেন্ট দ্বিগুণ হবে, তখন সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’

অতীতে দেখা যেত, নির্বাচন এলেই পুলিশ রাস্তা থেকে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্রাক বা বাস ‘রিকুইজিশন’ বা সাময়িক হুকুমদখল করত। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (পরিবহন) মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পুলিশ এখন আর সাধারণ মানুষের গাড়ি রিকুইজিশন করে না। অন্য পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রিকুইজিশন না করলে পুলিশকে সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব বহরের ওপর নির্ভর করতে হবে। আর সেই নিজস্ব বহরই এখন সংকটে রয়েছে।

এই সংকট কমাতে গত ২৯ এপ্রিল অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে গাড়ি কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, যানবাহন সমস্যা দূরীকরণ ও নাগরিক সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পুলিশের জন্য ২০০টি ডবল কেবিন পিকআপ, ১৫২টি মোটরসাইকেল, ৬৬টি অন্যান্য যানবাহনসহ মোট ৪১৮টি যানবাহন কেনা হয়েছে। জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তরের চাহিদার তুলনায় এটি কম। পুলিশের প্রাথমিক তালিকায় ৩৮টি জিপ, ২৫০টি ডবল কেবিন পিকআপ, ৫৬টি সিঙ্গল কেবিন পিকআপ, ২০টি ট্রাক, ১২টি প্রিজন ভ্যান, আটটি রেকার এবং চারটি এপিসি (আর্মার্ড পারসোনাল ক্যারিয়ার)সহ মোট ৭২২টি যানবাহনের চাহিদা ছিল। অর্থাৎ যা কেনা হচ্ছে তা দিয়ে চাহিদা পূরণ হবে না।

সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুলিশের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কিনতে গেলেই সরকারের টাকার অভাব দেখা দেয়, অথচ অন্যদের ক্ষেত্রে তা হয় না। গাড়ি ছাড়া পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে কী দিয়ে? স্ট্রাইকিং ফোর্সের জন্য দ্রুতগামী গাড়ি লাগবে। এখনো সময় আছে, প্রয়োজনীয় গাড়িগুলো দ্রুত কেনা দরকার। তা না হলে নির্বাচনের সময় পুলিশ বড় ধরনের প্রশাসনিক ও অপারেশনাল সংকটে পড়বে।’