Image description
সরকার ও ইসি চাপে রাখার কৌশল

বেশ কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও নির্বাচন সামনে রেখে ফের নানা তৎপরতা শুরু হয়েছে। নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে মহলবিশেষ নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সেরকম কিছু জানান দিচ্ছে। দেশে অহরহ ঘটছে রাজনৈতিক ও গুপ্তহত্যার ঘটনা। গত দুই দিনে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। বুধবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে গাজীপুরের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোগরখাল এলাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির এক নেতাকে গুলি করে তার মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই দিন ভোরে শরীয়তপুরের জাজিরায় ককটেল বিস্ফোরণে এক যুবক নিহত হন। পুলিশের ধারণা-ককটেল বানানোর সময় এ বিস্ফোরণ ঘটে।

এর আগে প্রকাশ্য দিবালোকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি এবং পরে তার মৃত্যু ঘিরে অন্তত দুই সপ্তাহ পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকে। ভোটের তফসিল ঘোষণার পরও এসব নেতিবাচক ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা শঙ্কা দেখা দিয়েছে। হচ্ছে কঠোর সমালোচনাও। এছাড়া নির্বাচনের বাইরে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিকরাও বসে নেই। যে কোনো উপায়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালাচ্ছে তারা।

এমন পরিস্থিতিতে মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধেও বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রকারীদের পালে হাওয়া দিচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো প্রকাশ্যে নানা অভিযোগ তুলছে। জামায়াত নেতারা একদিকে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। দলটির অভিযোগ-প্রশাসন একটি দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এনসিপিও প্রায় একই সুরে কথা বলছে। বিএনপির দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন দলটির নেতারা। প্রশাসন ও বিএনপিকে ঘিরে অভিযোগ তুলছে তারাও। নির্বাচন সামনে রেখে এসব কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নতুন তৎপরতা হিসাবে বিবেচনা করছেন। তারা বলছেন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ এবং বানচাল করার অপচেষ্টা এখনো চলমান আছে। এমন পরিস্থিতিতে এই অনৈক্য ও বিরোধ নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে কি না, সে আলোচনাও উঠছে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, এখানে দুটি বিষয় আছে। প্রথমত, নির্বাচন বানচালের চেষ্টা তো একটা গোষ্ঠী করছেই। তারাই এসব হত্যাকাণ্ড করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এখানে পরাজিত শক্তির ইন্ধন আছে। তারা নির্বাচন বানচালে সব ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। দ্বিতীয়ত, মূলধারার যেসব রাজনৈতিক দল এখন আছে, যেমন: বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি-তাদের মধ্যে মতবিরোধ কিছু থাকতেই পারে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটা থাকে। আদর্শগত ব্যবধান থাকে। কিন্তু এখানে আমরা যদি নির্বাচন চাই, তাহলে দলগুলোকে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তা না হলে নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্রকারীরা সুযোগ পাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগগুলো চাপে রাখার কৌশল হতে পারে। আবার নির্বাচনি কৌশলও হতে পারে। তবে এখানে বড় কথা হচ্ছে-অভিযোগগুলো সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে হতে হবে। সুনির্দিষ্ট হতে হবে। কারণ, এগুলো যদি ভিত্তিহীন হয় এবং প্রকৃত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে না হয়, তাহলে সেখানে অবিশ্বাসের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এ অনৈক্য নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের সুযোগ তৈরি করে দেয়। ফলে আমার মনে হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর এখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। এছাড়া অভিযোগ তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে হলে সেখানে ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ থাকে বলেও মনে করেন বদিউল আলম মজুমদার।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে যেসব দল মাঠপর্যায়ে একটু দুর্বল অবস্থায় থাকে, তারা সবলদের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ তুলে জনগণের সহানুভূতি পেতে চায়। প্রশাসনকেও একটা চাপে রাখে। এ ব্যাপার তো ঐতিহাসিকভাবে আছে। এখানেও হয়তো সেটাই কাজ করছে। ফলে এটা এক ধরনের তৎপরতা। তিনি আরও বলেন, তবে বাংলাদেশে নির্বাচনকে ঘিরে বিপদ একেবারে কেটে গেছে, এরকমও ভাবার কোনো কারণ নেই। এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টাও আছে। এটাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে এখন দিন যত যাবে, প্রশ্নগুলো উঠানোর গভীরতার ওপর বা যারা এগুলা বলছে, তাদের আচরণ বা অন্যান্য কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে কোনটা কাজ করছে।

এদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে আসার পর মিডিয়া, দেশ এবং বিদেশের সব ফোকাস এখন তার দিকে। ফলে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে দলটির সঙ্গে আসন সমঝোতার ভাগিদার হতে নতুন করে যোগ দিয়েছে এনসিপি। তবে গত কয়েকদিনে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতা সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে সরাসরি আক্রমণ করে কথা বলছেন। জাতীয় নির্বাচন যখন দোরগোড়ায় তখন তাদের এ ধরনের বক্তব্য নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এটা সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল।

বুধবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, অতীতের মতো আরেকটি পাতানো নির্বাচনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে একটি দলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে; প্রশাসন যেভাবে আনুগত্য দেখাচ্ছে, তাতে অতীতের মতো পাতানো নির্বাচন হতে পারে। এ ধরনের নির্বাচন দেশকে আবারও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।

একইদিন নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সারা দেশে মারাত্মকভাবে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করে জামায়াতে ইসলামী। এর আগে রোববার দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত। তাদের দাবি, তথ্য প্রমাণ, কাগজপত্র দাখিল করার পরও আইনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন বিষয় ধরে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রার্থিতা বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে প্রশাসন বিএনপির দিকে হেলে পড়েছে, এমন বক্তব্য ছাড়াও বিভিন্ন সময় দলটির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আসছে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সোমবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘আজাদী পদযাত্রা’র আগে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য পাচ্ছি, প্রশাসন একটি দলের দিকে হেলে পড়েছে। সেই দলটি হলো বিএনপি।’ এছাড়া দলটির আরও একাধিক নেতা বিভিন্ন সময় সভা-সেমিনারে বা সামাজিক মাধ্যমে সরকার, ইসি ও বিএনপির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছে।

জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নির্বাচনি মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান মাহবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, আমরা সুস্পষ্টভাবে আমাদের অভিযোগগুলো করেছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, সচিবরা তাদের পার্টি অফিসে গিয়ে দেখা করছেন। প্রশাসনের লোকজন গিয়ে হাজিরা দিচ্ছেন। এগুলো হলে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের মধ্যে ভিন্ন বার্তা যায়। আমরা প্রার্থিতা বাছাই প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট দেখলাম প্রশাসন কিভাবে একপাক্ষিক আচরণ করছে।

এদিকে বিএনপি মনে করছে, কোনো কোনো দল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। হঠাৎ করে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ ও কোনো কোনো নেতার বিএনপির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া এরই অংশ। তবে জণগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণও বুঝে। দলটির নেতারা বলছেন, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র এখনো চলছে। দীর্ঘ বছর ধরে দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তারা ভোট দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। সুতরাং কোনো কথাবার্তায় জনগণ আর বিভ্রান্ত হবে না। তাই কোনো ষড়যন্ত্র করে আর লাভ হবে না। এবারের নির্বাচন হবে ইতিহাসের সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। সারা দেশে নির্বাচন নিয়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।

জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, কয়েকটি দলের বক্তব্যে নতুন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টির শঙ্কা তো আছেই। মাঝখানে শঙ্কার গতিটা একটু কমে গিয়েছিল, এখন আবার গতিটা বেড়েছে। ডিসি-এসপিরা একটি দলের, পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে-এই যে অনুমাননির্ভর তথ্য প্রমাণ ছাড়া মুখস্থ আওড়ানো-এটা তো একটা রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। যারা নিজেদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাবেন বলে দাবি করেন বা আশা করেন, তাদের কাছ থেকে এই ধরনের বক্তব্য আসা মানে জনগণকে বিভ্রান্ত করে গড়ে তোলা। এর ফলে মনে হচ্ছে- এই তো বোধ হয় আগের আমল আবার ফেরত আসল। কথায় কথায় অভিযোগ করা ঠিক নয়। কথাবার্তা বলার ব্যাপারে তাদের আরও সতর্ক ও সংযত হওয়া উচিত। না হলে তো সাধারণ মানুষের মনে একটা শঙ্কা থেকেই যায়। আর যে হারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, মানুষ তো এমনতিই আতঙ্কে আছে। এর মধ্যে যদি আবার রাজনৈতিক আতঙ্ক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে মনে করতে হবে নির্বাচন নিয়ে কোনো গভীর ও সুদূরপ্রসারী একটা পরিকল্পনা আছে।

প্রথমদিকে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধসহ বেশ কিছু ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে এনসিপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি ইসলামী দলের মতপার্থক্য দেখা দেয়। তবে মাঝখানে কিছুদিন এসব বিরোধের বিষয় সামনে আসেনি। সম্প্রতি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করে। এরপর শোক বইতে স্বাক্ষরসহ সমবেদনা জানাতে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী সংগঠনসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে আসতে শুরু করে। এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে অনেকের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও সংক্ষিপ্ত বৈঠক হয়েছে। শোকপ্রকাশের বিষয় হলেও প্রকারান্তরে নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। এছাড়া অনেকের ধারণা- দেশের বড় দল হিসাবে আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির সরকার গঠনের সুযোগ ও সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ফলে ভোটের আগেই বিএনপি এখন সরকার গঠনের পথে থাকা দল হিসাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। কিন্তু এরকম আবহ জামায়াত ও এনসিপিসহ এগারোদলীয় জোটের মধ্যে কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে। এ কারণে এগারোদলীয় জোট ও সরকার এবং বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে।