Image description

খাগড়াছড়ির রামগড়ে ভারতের স্বার্থে নির্মিত স্থলবন্দরের জমি ভরাটে পরিবেশ ধ্বংস করে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে-এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললেও তা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না বলে তাদের দাবি।


স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের অন্তত তিনটি পাহাড় সম্পূর্ণ কেটে ফেলা হয়েছে। এসব পাহাড়ের মাটি রাতের আঁধারে ট্রাকে করে খাগড়াছড়ির রামগড়ে ভারতের স্বার্থে নির্মিত স্থলবন্দরের জমি ভরাটে পরিবেশ ধ্বংস করে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে-এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললেও তা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না বলে তাদের দাবি।


স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের অন্তত তিনটি পাহাড় সম্পূর্ণ কেটে ফেলা হয়েছে। এসব পাহাড়ের মাটি রাতের আঁধারে ট্রাকে করে করছেন, কাজ প্রায় শেষের দিকে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ও বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সূত্র জানায়, ভারতের আবদারে খাগড়াছড়ি ও ফেনী সীমান্তের রামগড়ে স্থলবন্দর প্রকল্প গ্রহণ করে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। শেষ না হওয়া সত্ত্বেও ভারতের আগ্রহে গত বছরের ১৪ আগস্ট যাত্রী পারাপারের জন্য বন্দরের কার্যক্রম উদ্বোধন করার দিন নির্ধারণ করে পতিত সরকার। কিন্তু ৫ আগস্ট পতন হয় হাসিনা সরকারের। এতে বন্ধ হয়ে যায় স্থলবন্দরটির উদ্বোধনী কার্যক্রম।


গত ১০ জানুয়ারি এ বিষয়ে আমার দেশ-এ বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের দুদিন পর রামগড় স্থলবন্দর পরিদর্শনে যান অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, এই বন্দর মূলত ভারতের  ৮১ম পৃষ্ঠার পর স্বার্থে তৈরি হচ্ছে এবং এতে একতরফাভাবে লাভবান হবে ভারত। প্রকল্পে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি পুনর্নিরীক্ষার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের কথাও জানান তিনি।


সরকার পতনের আগে প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও পরবর্তী অংশ সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল। তবে বর্তমানে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ফেনী নদীর তীরবর্তী এলাকায় পাহাড় কেটে আনা মাটি দিয়ে ট্রাক টার্মিনালসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। বালুর বদলে মাটি, মান নিয়ে শঙ্কা এ প্রকল্পে ভারতের স্বার্থে পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি বালুর পরিবর্তে মাটি ব্যবহার করায় শতকোটি টাকার এ স্থাপনার মান ও স্থায়িত্ব নিয়েও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, পুরো প্রকল্প তৈরিতে অসংখ্য পাহাড় সাবাড় করা হয়েছে। প্রকল্পের মধ্যে মিরসরাইয়ের বারৈয়ারহাট থেকে রামগড় পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার পাহাড়ি এলাকায় চার লেনের সড়ক তৈরির প্রকল্প রয়েছে। এই এলাকার মধ্যে রিজার্ভ ফরেস্টও আছে। অসংখ্য পাহাড় আর সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করেই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানে তাদের পতন হলে নতুন করে পরিবেশ ধ্বংস হবে না এমন আশায় বুক বাধেন স্থানীয়রা। কিন্তু তাদের হতাশ করে অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে নতুন করে পাহাড় কাটায় মেতেছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।


পাহাড় কাটা ও প্রশাসনের ভূমিকা রামগড় পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বলিটিলা মসজিদের সামনে একটি পাহাড়, একই ওয়ার্ডের আরেকটি পাহাড় এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব চৌধুরীপাড়া এলাকার একটি পাহাড় পুরোপুরি কেটে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মাটি ভরাট ছাড়াও পুরো প্রকল্প তৈরিতে ছোটবড় অসংখ্য পাহাড় কেটে ধ্বংস করা হয়েছে। অনেক পাহাড় খাড়াখাড়িভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে কাটা হয়েছে। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি পাহাড় ধসে জীবনহানিরও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বালি ভরাটের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন দ্রুততার সঙ্গে বন্দরের ইয়ার্ডের কাজ শেষ করা হচ্ছে।


এ ব্যাপারে রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী শামীম বলেন, গত মাসে পাহাড় কাটার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আগের সরকার আমলে এখানকার একজন উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এই পাহাড়গুলো কেটে প্রকল্পে মাটি সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে পাহাড় কাটা হচ্ছে না। তারপরও স্থানীয়রা যখন অভিযোগ করেছে, তখন বিষয়টি তদন্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বালুর পরিবর্তে পাহাড়ি মাটি ব্যবহার করায় শতকোটি টাকার এ প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রামের সম্পাদক খান মোহাম্মদ আমিনুর রহমান বলেন, ভরাটের কাজে সাধারণত নদীর বালি ব্যবহার করা হয়। পাহাড়ি মাটির কমপ্যাকশন কম হওয়ায় সময়ের সঙ্গে জমি দেবে যাওয়া, ফাটল ধরা ও অবকাঠামোর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে ওই জায়গার ওপর নির্মিত পুরো অবকাঠামোর মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য।


বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালে রামগড়ের মহামুনি এলাকায় অধিগ্রহণ করা ১০ একর জমিতে ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট (আইসিপি), কাস্টমস অফিস, প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন, পোর্ট বিল্ডিং, ট্রান্সশিপমেন্ট শেড, ওয়‍্যার হাউস, ইয়ার্ড ও আবাসিক ভবন নির্মাণে ১৬১ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়।


প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথমে মনিকো লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়। তবে ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি কাজ শুরু হলে ভারতের ডিজাইনে কাজ না হওয়ার অজুহাতে তাতে বাধা দেয় সে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ। এক বছরের বেশি সময় কাজ বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিল হয়।


পরে ভারতীয় পক্ষের সম্মতির পর প্রকল্প আবার চালু হলে এমএসসিএল আন্ড এমএসডিবিএল জেবি ও মনিকো লিমিটেডকে যৌথভাবে নতুন করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে মনিকো লিমিটেড বন্দরের ১০ একর জমি ভরাটসহ ওয়্যার হাউস, ইয়ার্ড, রিটেইনিং ওয়াল, বাউন্ডারি ওয়াল ও দুটি ওয়েব্রিজ স্কেল নির্মাণের জন্য প্রায় ৮৯ কোটি টাকার কাজ পায়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রায় ২২ ফুট উচ্চতায় বালু দিয়ে ভরাট করার কথা থাকলেও বাস্তবে পাহাড় কেটে আনা মাটি দিয়েই পুরো এলাকা ভরাট করা হয়েছে।
বিষয়টি স্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মনিকো লিমিটেডের স্থানীয় ব্যবস্থাপক হাফিজুর রহমান জানান, প্রজেক্টের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা বিশ্বপ্রদীপ কারবারির একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্টে বালি ভরাটের কাজ দেওয়া হয়েছিল। কন্ট্রাক্টে উল্লেখ ছিল পাহাড়ি ঝরনার বালি সরবরাহ করতে হবে। খাগড়াছড়ি এলাকার সব বালিই লাল রঙের, তাই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পাহাড় কেটে বালি সরবরাহ করলে তা বোঝার উপায় নেই।


একতরফা লাভ ভারতের রামগড়ের ওপারে আসামের গোহাটি ও ত্রিপুরার আগরতলা সেভেন সিস্টারের মূল বাণিজ্যিক কেন্দ্র। নিকটতম মূল শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে কলকাতা। শিলিগুড়ি করিডোর হয়ে গোহাটি কিংবা আগরতলার দূরত্ব এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৬৫০ কিলোমিটারের মধ্যে। দুর্গম ও পাহাড়ি এসব পথে ভারী পরিবহন চলাচল একেবারেই অসম্ভব। বিপরীতে রামগড় হয়ে আগরতলার সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব মাত্র ৩০০ কিলোমিটার আর গোহাটির দূরত্ব ৬০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। রামগড় বন্দর হয়ে ট্রানজিট সুবিধা পেলে বিচ্ছিন্ন এ রাজ্যগুলোর সঙ্গে সহজ যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হবে ভারতের। আর এ কারণেই ছোট্ট এ বন্দরের প্রতি তাদের এত আগ্রহ।


রামগড় ব্রিজ পার হলে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম এলাকার অবস্থান। এ সাবরুমকে কেন্দ্র ধরে সম্প্রতি সেভেন সিস্টারের রাজ্যগুলোর সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে কানেকটিভিটি বাড়িয়েছে ভারত। তাদেরই আগ্রহে রামগড়ে বন্দর তৈরি করে দিচ্ছে বাংলাদেশ। এর আগে ফেনী নদীর ওপর নিজস্ব অর্থায়নে ১৩৩ কোটি টাকা খরচ করে ব্রিজ বানিয়ে দিয়েছে দিল্লি। রামগড় থেকে বারইয়ারহাট পর্যন্ত রাস্তা বানানোর খরচের প্রায় অর্ধেকের জোগানও দিয়েছে দেশটি। তবে এই টাকা চড়া সুদে নিয়েছে বাংলাদেশ।
চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিট সুবিধায় তামাবিল, আখাউড়া ও রামগড় বন্দর দিয়ে পণ্য নেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছে ভারত। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর থেকে তামাবিলের দূরত্ব ৪০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। আখাউড়াও ২০০ কিলোমিটারের বেশি। কিন্তু রামগড় মাত্র ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে। ফলে বন্দর চালু হলে একচেটিয়া ট্রানজিট সুবিধা ভোগ করবে ভারত।


নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বক্তব্য রামগড় বন্দরের নামে ভারতের সঙ্গে যে কানেকটিভিটি তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শহীদ উল্লাহ চৌধুরী
জানান, রামগড় থেকে বঙ্গোপসাগরের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারের কিছু বেশি। তাই এ এলাকাটি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি। ভারতের জন্য চিকেন নেক যেমন গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জন্য রামগড়ও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। ছোট্ট এ এলাকাটি দখলে নিতে পারলে পুরো চট্টগ্রাম, থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বন্দরের জন্য সেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার আগে সরাসরি ভারতের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বাংলাদেশের ছিল না। ফেনী নদী প্রাকৃতিকভাবে দুই দেশকে আলাদা করার পাশাপাশি সীমান্ত সুরক্ষিত করে রেখেছিল। কিন্তু এই স্থলবন্দরের জন্য নদীর ওপর নির্মিত সেতু আমাদের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।


২০১০ সালে রামগড়কে স্থলবন্দর ঘোষণা করে সরকার। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো। এর ধারাবাহিকতায় রামগড় বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য রামগড় স্থলবন্দর প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব শামসুল আলম বলেন, মূলত ভোলাগঞ্জ, শ্যাওলা ও রামগড়-এ তিনটি বন্দর নিয়ে একটি প্রকল্প, যার কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। সেক্ষেত্রে রামগড় বন্দরের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে বন্দর কবে চালু হবে, সে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।