Image description
গুমসংক্রান্ত কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মত

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ভিন্নমত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে গুমের মাধ্যমে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়েছে। গুমের পর হত্যা করা হয়েছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে। গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘মায়ের ডাক’র তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে গুম থাকা ৭০৫ জনের মধ্যে এখনো ৩৫০ জন ভুক্তভোগীর সন্ধান পাননি স্বজনরা। পথ চেয়ে বসে আছে ওই সব নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার। গুমের বর্বরতা দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এমনকি জাতিসংঘও দিয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

গুমসংক্রান্ত কমিশনের তথ্য বলছে, আওয়ামী দুঃশাসনের সময়ে গুমের ঘটনার নেপথ্যে সব থেকে বেশি ভূমিকা রেখেছে র‌্যাব। গুমের ২৫ ভাগই র‌্যাবের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে র‌্যাব বিলুপ্তিসহ একগুচ্ছ সুপারিশও করা হয়। ওই সুপারিশে ফ্যাসিস্ট আমলে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নানা অপতৎপরতার বিষয়ও সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

দেশের বিশিষ্টজন গুমসংক্রান্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দিলেও র‌্যাব বিলুপ্তি নয় বরং সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন। এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেছেন। তারা মনে করেন, বিগত বিএনপি সরকারের আমলে সে সময়ের বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেই র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল। সন্ত্রাস দমনে র‌্যাব সফলতাও পেয়েছিল। তবে পরে ব্যক্তি স্বার্থে র‌্যাবের কিছু কিছু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে সমালোচনার মুখে পড়ে পুরো বাহিনী। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হলে র‌্যাব আরও জনকল্যাণমূলক কাজ করবে বলে মনে করছেন তারা। এছাড়া বিশেষ কাজের জন্য র‌্যাব ফোর্স থাকলেও সেখান থেকে সামরিক বাহিনীর লোকদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন।

র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশের বিষয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আশরাফুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, র‌্যাব সম্পর্কে বিভিন্ন রকম সমালোচনা-আলোচনা হয়েছে। র‌্যাবের যে ধরনের কর্মকাণ্ড ছিল তাতে জনগণ খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। অনেকে মনে করেন, এটা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু বিলুপ্ত করে দেওয়াই সমস্যার সমাধান নয়।

তিনি বলেন, র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল একটি উদ্দেশ্য নিয়ে। এটা সত্যি যে, গঠনের শুরুতে র‌্যাবের সে উদ্দেশ্যটা সফল হয়েছে। পরে কেন র‌্যাব সমালোচিত হলো, এর জন্য কারা দায়ী তা দেখতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু র‌্যাব বাতিল করে দিতে হবে আমি এটা মনে করি না। র‌্যাবের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা যেতে পারে।

গুমসংক্রান্ত কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র‌্যাব জড়িত, এরপর পুলিশ ২৩ শতাংশ। এছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই ব্যাপক হারে গুম করেছে। বহুক্ষেত্রে সাদা পোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে গুম-অপহরণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে এই কাজে যুক্ত করা হয়। তদন্তে মোট ৪০টি বন্দিশালা পেয়েছে কমিশন। এর মধ্যে র‌্যাবের ২২ থেকে ২৩টি। গুম কমিশন কাজ শুরু করার পর র‌্যাব সবচেয়ে বেশি আলামত ধ্বংস করেছে।

কমিশন বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, গুমের ক্ষেত্রে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এবং র‌্যাব যেভাবে অভিযুক্ত, এই অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যতই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করি না কেন-তারা এ কাজগুলো করেছে। মূলত সরকারকে তুষ্ট করার জন্যই কাজগুলো করেছে। তবে যে প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে র‌্যাব সৃষ্টি হয়েছিল সেই প্রেক্ষাপট কিন্তু এখনো আমাদের দেশে আছে। কোনো একটা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে র‌্যাবকে কিংবা আরও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে সবাইকে বিলুপ্ত করে দেওয়া যায়। কিন্তু এরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যে কাজগুলো করে সেই কাজ করার জন্য সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। এই জায়গা থেকে আমরা বলছি র‌্যাবে প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তি অভিযুক্ত। র‌্যাবের পরিচয় কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো কর্মকর্তা অপরাধ করেছেন। তাদের বিচারের মুখোমুখি করা গুরুত্বপূর্ণ। আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের বাস্তবতায় র‌্যাব বিলুপ্ত করার পরিবর্তে এর সংস্কার করাটা খুব প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুমের প্রসঙ্গ তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। এই রাজনৈতিক কারণের ব্যাপার দুই ধরনের। বাংলাদেশে অধিকাংশ সময় যারা সরকারে থাকেন তাদের দোষারোপ করা হয় যে, সরকার এদের দিয়ে কাজগুলো করিয়েছে। কিন্তু উভয় বাস্তবতাই আছে। যারা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন তারা সরকারের কাছে আস্থাভাজন হওয়ার জন্য কিংবা নিজের সুবিধা ও ভালো পদায়ন-পদোন্নতির জন্য তারাও কখনো কখনো নিজ উদ্যোগে সরকারকে এ ধরনের নীতি বা অধিকারবহির্ভূত পরামর্শ দেন। সরকার তখন চিন্তা করে এর ফলে বিরোধী দলকে দমনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা সহজ হবে। তখন যারা ক্ষমতায় থাকে তারা এ ধরনের পরামর্শ গ্রহণ করে। সুতরাং যারা ভবিষ্যতে সরকারে আসবেন তারাও এই ধরনের গোয়েন্দা সংস্থা বা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কোনো ব্যক্তিকেই ব্যবহার করবেন না, কারও মতামতকে কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করবেন না-এই নীতি গ্রহণ করতে হবে।

ড. তৌহিদুল হক বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জবাবদিহিমূলক পরিবেশের আওতায় আনতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে ভবিষ্যতে তাদের আইনের মুখোমুখি করতে হবে।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, র‌্যাব একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিল, উদ্দেশ্যও ভালো ছিল। বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছিল র‌্যাব। শুধু পুলিশ দিয়ে র‌্যাব গঠন করলে কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে অনেকের সংশয় ছিল। অনেকের ধারণা ছিল, পুলিশ সোসাইটিতে এক্সপোজড; তাদের জনগণের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে হয়, তারা অতটা কার্যকর নাও হতে পারে।

তিনি বলেন, র‌্যাব গঠনের সময় সিদ্ধান্ত ছিল, রাজনৈতিকভাবে তাদের ব্যবহার করা হবে না। বিএনপি আমলে র‌্যাব যখন গঠন করা হলো তখন তাদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ খুশি ছিল। বিএনপির আমলে দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে, হত্যা হয়েছে যেটা আমরা ফিল করেছি, আলোচনাও হয়েছে। ওইসব ক্ষেত্রে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, পরে আওয়ামী লীগ আমলে ভাড়ায়ও খেটেছে র‌্যাব। লোকজনের থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপ বা নিরীহ লোকজনকে হত্যা করেছে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা ও গুম করা হলো। জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞাও দিল।

বিলুপ্তি একটি পলিটিক্যাল ডিসিশন। জঙ্গি দমন, যে কোনো সন্ত্রাসী দমনে একটি বিশেষ বাহিনী থাকতেই পারে। সেক্ষেত্রে র‌্যাবের প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার বলে তিনি মত দেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক যুগান্তরকে বলেন, আমি কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। তবে বিশেষ কাজের জন্য র‌্যাব নামে একটি বিশেষায়িত ফোর্স থাকতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে সামরিক লোকদের বাদ দিতে হবে। র‌্যাব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হবে। সেখান থেকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর লোকদের আস্তে আস্তে বাদ দিতে হবে।

তিনি বলেন, র‌্যাবে সামরিক বাহিনীর লোকজন আছে। এছাড়া সামরিক বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে। সার্বিকভাবে সেনাবাহিনীকে যখন আভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলায় নিয়োগ করা হয়; সারা বিশ্বের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে-সব সময় এটা আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক হয় না। আপাতত হয়তো বিশৃঙ্খলা ঠেকানো যায়, কিন্তু আইনশৃঙ্খলাকে সামরিকায়ন করা এটা দীর্ঘকালীন সময়ে চলতে থাকলে সব দেশেই আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের বিকাশের অন্তরায় ঘটে। অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, যে দেশে যত গণতন্ত্র দুর্বল হয়, সে দেশে আইনশৃঙ্খলাকে তত সামরিকায়ন করা হয়। এটা আমাদের দুর্বল গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি প্রতিফলন।