Image description
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দুই বছর

বহুল আলোচিত ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনের দুই বছর পূর্তি আজ ৭ জানুয়ারি। এদিন একতরফাভাবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বড় দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে। ওই নির্বাচন হয়েছিল মূলত আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও একই দলের বিদ্রোহীদের মধ্যে। এ কারণে এ নির্বাচন ‘আমি-ডামি’ হিসাবে পরিচিতি পায়। ওই নির্বাচনের ফলাফলও ছিল বড় অদ্ভুত। আওয়ামী লীগ একাই ৩০০ আসনের মধ্যে ২২৪টিতে জয় পেয়েছিল। বিরোধী দল হওয়ার মতো আসন পায়নি কোনো রাজনৈতিক দল। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬২টি আসনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। আর জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ১১টি আসন। এর বাইরে তিনটি রাজনৈতিক দল একটি করে আসন পায়। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন করার দায়ে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালকে কারাগারে যেতে হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশনাররা পলাতক রয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এমন আমি-ডামি নির্বাচনই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পরাজয় ত্বরান্বিত করেছে। ওই নির্বাচনে সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় তার পতন হয় এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। তারা বলেন, কোটাবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন হলেও তার রাজনৈতিক পরাজয়ের বীজ বপন হয় ২০১৪ সালের ‘একতরফা’ নির্বাচনে। ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোটের’ পর ২০২৪ সালে ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে না পারার তীব্র ক্ষোভও কোটাবিরোধী আন্দোলনকে জোরদার করে। যদিও শেখ হাসিনা দেড় হাজার মানুষ মেরে ওই আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন-২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন শেখ হাসিনার পতনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। ওই তিন বিতর্কিত নির্বাচনের ফলে সরকার ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরপর তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারায় মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়। গুম-খুন, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, উন্নয়নের নামে অনিয়ম-দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ব্যাংক লুটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে যখন কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, তখন বিক্ষুব্ধ মানুষ ওই আন্দোলনে যুক্ত হয়। এতেই ওই আন্দোলন বিক্ষুব্ধ মানুষের প্ল্যাটফর্মে রূপ নেয়। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুর্বল সরকার ওই আন্দোলনের মুখে দাঁড়াতে পারেনি। দলটির পতন হয়েছে।

একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি হিসাবে যেসব প্রস্তুতি নেওয়া দরকার হয়, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তার সবই করেছিল তৎকালীন কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন। তবে প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট। বিএনপির নামের সঙ্গে মিল রেখে তৃণমূল বিএনপি নামক রাজনৈতিক দল নিবন্ধন দিয়ে বিতর্কিত হয়েছিল। ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ, অনুগত কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রশাসন সাজানোসহ সব ধরনের আয়োজন ছিল ওই নির্বাচনে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে নেওয়া হয়েছিল নানা উদ্যোগ। কিন্তু ওইসব উদ্যোগে সাড়া দেননি সাধারণ ভোটাররা। ওই নির্বাচনে তিনশ আসনে প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৯৭৬ জন। ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৮৯ হাজার ভোটারের মধ্যে ৫ কোটি ২ লাখ ৯১ হাজার ভোট পড়ে, যা মোট ভোটারের ৪২ শতাংশ। যদিও ভোটের এই হার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ওই নির্বাচনে যে ভোট পড়েছে তার ৬৫ দশমিক ১৫ শতাংশ পেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও ছয় মাসের মাথায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয়।

নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করায় দল হিসাবে আওয়ামী লীগও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ। যুগান্তরকে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার অনেক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল। কিন্তু তারা নির্বাচন ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। নির্বাচনের নামে পরপর তিনবার প্রহসন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নামক দলটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দেশের বড় ক্ষতি করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমেরিকাসহ অন্যান্য যেসব দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, সেসব দেশের সরকারও শক্তিশালী হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে নিজেদের ক্ষতি করেছে। তাদের সময়ের নির্বাচনগুলো তাদের জন্য আত্মঘাতী হয়েছে। এই ঘটনা থেকে সব দলকে শিক্ষা নিতে হবে। অন্যথায় আবারও এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে।

আলতাফ পারভেজ বলেন, এই অবস্থা থেকে নির্বাচন ব্যবস্থাকে তুলে আনা বিরাট চ্যালেঞ্জ। একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া বড়ই প্রয়োজন। মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ভালো নির্বাচন হওয়া দরকার।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুই বছর এক মাসের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কিনা-এমন প্রশ্ন করা হলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার যুগান্তরকে বলেন, ২০২৪ সালের মতো কোনো নির্বাচন হবে না। আমরা একটি ভালো নির্বাচন করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ করে আসন্ন নির্বাচন হতে যাচ্ছে।