Image description
 

নীরবতার মধ্যেও কিছু কথা থাকে, যা শব্দের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতে আসা মানুষের ঢল যেন সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। আপসহীন নেত্রী বেগম জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর ইহলোক ত্যাগ করে অমর হয়েছেন। কিন্তু এখনো তার প্রতি মানুষের ভালোবাসার কমতি নেই। চলে যাওয়ার সাতদিন পরও তার কবরের পাশে এসে নীরবে অশ্রু ঝরাচ্ছেন দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

 

সাধারণ মানুষের এ অশ্রু খালেদা জিয়ার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর ত্যাগের প্রতি দায়বদ্ধতার। দলমত, পরিচয়, অবস্থান-সবকিছু পেছনে ফেলে তার কবরের পাশে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষ জড়ো হচ্ছেন। বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ভিড় করছেন সেখানে। কেউ আসছেন ফুলেল শ্রদ্ধা জানাতে, কারো মুখে পবিত্র কোরআনের বাণী, কেউবা হাত তুলে স্রষ্টার কাছে নিবেদন করছেন প্রিয় নেত্রীর রুহের মাগফিরাতের। তাদের বয়স-ভাষার উচ্চারণে ভিন্নতা থাকলেও সবাই যেন একই অনুভূতি নিয়ে জড়ো হয়েছেন সেখানে।

 
 

কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ করেন, কেউ চোখ মুছে নেন অজান্তেই। কেউ কেউ একদম নীরব কিন্তু চোখের অশ্রুতে বলে দেন অনেক না বলা কথা। এ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ যেন ফিরে যান সময়ের পেছনে-বেগম জিয়ার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোয়, গণতন্ত্রের দাবিতে রাজপথে নামা সেই দৃঢ় কণ্ঠের মোহনীয় বাণীতে, তার কারাগারের নিঃসঙ্গ রাতগুলোয়। সেই সঙ্গে শহীদ জিয়াকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন আগতরা।

তবে সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী যে দৃশ্য তা হলো, কবরের পাশে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি; যারা হয়তো কখনো রাজনীতির মিছিলে যাননি, যারা টিভির পর্দায় বেগম জিয়াকে দেখেই সীমাবদ্ধ ছিলেন-তারাও জড়ো হচ্ছেন বেগম জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে।

উপস্থিতদের মধ্যে কেউ বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) আমাদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কেউ বলেন, তিনি ছিলেন সাহসের নাম। কারো কাছে তিনি আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক। যদিও এ কথাগুলো বড় কোনো স্লোগান নয়, তবুও এর অনুভূতি গভীর।

কবর জিয়ারতে আসা মানুষগুলো যেন প্রমাণ করে দিলেন-নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতায় থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; কিছু মানুষ সময়, দল, মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। খালেদা জিয়ার কবরের পাশে সে সত্য আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

দিনের আলো ফুরিয়ে আসে, মানুষের সারি ছোট হয় কিন্তু তাদের শ্রদ্ধার ভার কমে না। কবরস্থানের নিস্তব্ধতায় রয়ে যায় মানুষের উপস্থিতির ছাপ-একটি জাতির স্মৃতি, একটি সময়ের সাক্ষ্য। আর সে নীরবতার মধ্যেই লেখা হয় এক অদৃশ্য নিবন্ধ, যা কাগজে নয়; মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকে।

মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা গেছে, কবরের এক পাশে দুই ব্যক্তি কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। একনিষ্ঠ মনে তাদের সে মহাবাণীর উচ্চারণ ছিল বেগম জিয়ার জন্য প্রভুর অনুগ্রহ কামনার উদ্দেশ্যে। আরো দেখা গেছে, কবরস্থানের কম্পাউন্ডের বাইরে জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন। এছাড়া বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা দলবল নিয়ে খালেদা জিয়ার কবরে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করছিলেন। কোরআন তেলাওয়াত ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছিল আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া চক্রের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি।

কবরের পাশে রা‌জশাহী‌ বিশ্ব‌বিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ফজলুল হক আমার দেশকে বলেন, বাংলা‌দে‌শের রাজনী‌তি জিয়া প‌রিবা‌র, বি‌শেষ করে খা‌লেদা জিয়া ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমা‌নের অবদান অপ‌রিসীম। তা‌দের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমা‌দের এখা‌নে আসা। বেগম জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষ‌তি হয়েছে।

বিএন‌পির রংপুর বিভাগের সহসাংগঠ‌নিক সম্পাদক অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, বেগম জিয়া আমাদের আদ‌র্শিক মা। তার অবদানকে স্মরণ করে দলমত নি‌র্বিশেষে বি‌ভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে ছুটে আসছেন। এখানে আমরা তার কবর জিয়ারত করে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে‌ছি, তি‌নি যেন তাকে জান্নাতের শ্রেষ্ঠ স্থান দান করেন।

রাজধানীর ৬০‌ ফিট এলাকা থেকে কবর জিয়ারত করতে আসা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, আমার কোনো রাজনৈ‌তিক পদ-পদ‌বি নেই। তবে জিয়া প‌রিবারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অপ‌রিসীম। শহীদ জিয়া আমার আইডল (আদর্শ), বেগম জিয়া আমাদের আপসহীন নেত্রী। তার জন‌প্রিয়তা সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছে। সেই বিশাল ব্য‌ক্তিত্ব বেগম জিয়া ও জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগ‌ফিরাত কামনায় এখানে এসে‌ছি।