ওসমান বিন হাদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি। এ হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর নাম প্রকাশ করা হয়েছে। যিনি হাদি হত্যা মামলার তিন নম্বর এজাহারনামীয় আসামি। চাঁদাবাজি ও ক্যাসিনোসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) মিন্টো রোডের ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী-বিরোধী অবস্থান নেওয়ার কারণেই ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়। আর এ হত্যাকাণ্ড বাপ্পীর সরাসরি নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী একসময় এলাকায় ‘ঝুট বাপ্পী’ নামে পরিচিত ছিলেন। গার্মেন্টস শিল্পের ঝুট কাপড়ের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার উত্থান। তার বিরুদ্ধে পরিবহন, গার্মেন্টস ঝুট কাপড়, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজার থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি তাকে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলছুটদের নিয়ে নতুন দল গড়ে তোলেন সাংবাদিক-রাজনীতিক ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) নামে ওই দলে যোগ দেন বাপ্পির বাবা নজরুল ইসলাম চৌধুরী।
মিরপুর-পল্লবীতে ঝুট মন্টু হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। পিডিপির প্রার্থী হিসেবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সেসবের কিছুই হয়নি। পিডিপিতে যোগ দেওয়ার আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন মন্টু। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে আবারও আওয়ামী লীগে ফেরেন। ২০০৯ সালের ২৬ মে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের নান্নু মার্কেটের সামনে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী জামিল গ্রুপের গুলিতে নিহত হন মন্টু। এর পরই পল্লবীর ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ রাজনীতিতে সক্রিয় হন বাপ্পি।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ২৬ বছর বয়সেই হারুন নিট, স্নোটেক্স, ইপিলিয়ন, ইভেঞ্জ, আজমত, ম্যাক্স-২০০০, শরৎ, আলানা, পূরবী অ্যাপারেলস, ডেকো ইন্টারন্যাশনাল, ইমা ক্লথসহ মিরপুর ও পল্লবী থানা এলাকার অর্ধশত গার্মেন্টের ঝুট কাপড়ের ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। এরপর প্রায় ১৫ বছর ধরে মিরপুর ও পল্লবী থানা এলাকার গার্মেন্টের ঝুট কাপড়ের ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য তার। ২০১২ সালের জুলাইয়ে ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হন বাপ্পি। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতির পদ পান তিনি।
২০২০ সালের ২৮ জুলাই রাতে কালশী কবরস্থানের কাছ থেকে রফিকুল ও শহিদুল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পল্লবী থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে দুটি পিস্তল, চারটি গুলি ও ওজন মাপার একটি যন্ত্র উদ্ধার করা হয়। ওজন মাপার যন্ত্র নিয়ে সন্দেহ হয় পুলিশের। খবর দেওয়া হয় বোমা নিস্ক্রিয়করণ ইউনিটকে। পরীক্ষার সময় ঘটে বিস্ফোরণ। এতে আহত হন চার পুলিশ সদস্য ও এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট চাঞ্চল্যকর এ মামলার চার্জশিট দেয়।
এতে বাপ্পিসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এছাড়া চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যাকা-ের একাধিক মামলার আসামি তিনি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দেশব্যাপী ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে বাপ্পির নামও আলোচনায় আসে।